শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৬ অপরাহ্ন

স্বশাসিত স্থানীয় সরকার কবে

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার

আবার সরগরম হতে শুরু করেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর কার্যত, স্থানীয় সরকার কাঠামো পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি সরকার বরাবর বলে আসছে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্বাচন নিয়ে তাদের নানাবিধ পরিকল্পনা রয়েছে। সে পরিকল্পনা আসলে কী, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। তবে স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এ প্রতিনিধিদের কেউই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নয়। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে নিয়োগের মাধ্যমে সরকার মূলত নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করেছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বাস্তব সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সমালোচনা করলে ভালো হয়। অনেকের মতে, আপাতত প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন সচল করার বিকল্প ছিল না। এদিকে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে অন্তত তিন মাস সময় চায় সরকার। অর্থাৎ এই তিন মাস নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে জোর দিচ্ছে সরকার। এটি একটি ইতিবাচক দিক। কারণ স্থানীয় সরকার কাঠামোর সঙ্গে একটি স্থানের মানুষের সেবা ও মৌলিক সেবার গুরুতর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার কাঠামোর পুরো শরীর, অবশ্যই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়া উচিত। সে লক্ষ্যে সরকারকে কাজ করতে হবে।

বিএনপি সরকার স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনের আগে তিন মাস সময় চেয়েছে। এ তিন মাস সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ক্ষমতা ও দর্শনের সংস্কার করার বিষয়ে ভাবতে হবে। কারণ আমাদের দেশে এখনো স্থানীয় সরকারের সুসংহত কাঠামোর অভাব আছে। উপমহাদেশে স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্ম মূলত স্থানিক পর্যায়ে স্বশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে গতিশীল রাখা। ১৮৮২ সালে লর্ড রিপন স্থানীয় সায়ত্তশাসনের ক্রমবিকাশ করেন। তিনি সরকারিভাবে মনোনীত প্রতিনিধিদের দ্বারা, স্থানীয় শাসন পরিচালনার প্রথা রহিত করেন। খানিকটা ইউরোপের আদলে গড়ে তোলা এ কাঠামো, আধুনিক সময়ে আরও পরিশীলিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হয়ে, এ কাঠামো বারবার পথচ্যুত হয়েছে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শুধু স্থানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে না। এটি স্থানীয় পর্যায়ে শাসনকার্য পরিচালনা করে। কিন্তু বিগত সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অনেকাংশে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোকে ব্যবহার করে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। এমনকি স্থানীয় সরকার কাঠামোর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও পরিচালনা করা যায় না। এখানে বলে নেওয়া ভালো, এ সরকারের জন্য যে বরাদ্দ নির্ধারিত থাকে তা মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি, জাইকা কিংবা অন্য কোনো দাতা সংস্থা থেকে সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজস্ব অর্থায়নের সুযোগ নেই। এমনকি এ সরকার কর আদায়ের ক্ষমতাও রাখে না। বরং তারা কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুসরণ করে। এমন অবস্থাকে কোনোভাবেই স্থানীয় শাসন বলা চলে না।

স্বশাসিত স্থানীয় সরকার দীর্ঘদিনের দাবি। কারণ জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মানুষের আগ্রহ, অনুভূতি অনেক বেশি। স্থানীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটি মানুষই চায় তাদের দাবি-দাওয়া স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি পূরণ করুক। কিন্তু যেহেতু স্থানীয় সরকার বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে, তাই তাদের কার্যপরিধি বিস্তৃত হলেও ফলপ্রসূ কার্যক্রম নেওয়া সম্ভব না। এ বিষয়টি কোনো সরকারই অনুধাবন করতে পারেনি। তবে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্ভবত এ সরকার কাঠামোর গুরুত্ব কিছুটা অনুধাবন করতে পেরেছিল। এ জন্য একটি কমিশনও গঠন করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতকালে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পর কমিশন কার্যকারিতা হারায়। এর পেছনেও আমলাতন্ত্রের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ। ওই সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন আমলা বুঝিয়েছিলেন, স্থানীয় স্বশাসন প্রতিষ্ঠা হলে কেন্দ্রীয় সরকার ও এমপিরা কর্তৃত্ব হারাবেন। তারা ভুলে গেলেন, এখানে কর্তৃত্বের প্রসঙ্গ নয় বরং স্বশাসনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকারের দর্শন বোঝা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের চাহিদা, আকাক্সক্ষা ও দাবি-দাওয়ার প্রতিফলন ঘটানোর জন্যই এ সরকার কাঠামো রয়েছে। তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আবার সরকারের কাছেও তাদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে যখন কার্যক্রম মসৃণ করা যায়, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিমালা আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে অঞ্চলভেদে কিছু বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। সামাজিক কল্যাণ খাতের নির্ধারিত বরাদ্দ স্থানীয় সরকারকে বণ্টনের দায়িত্ব দিলে তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছুবে। এক্ষেত্রে জবাবদিহি ও তদারকি করাও অনেক সহজ হবে। আবার উন্নয়ন কর্মকা-ের ক্ষেত্রে শর্ত দিয়ে অনেক কাজ করা যায়। স্থানীয় এলাকায় উন্নয়ন কর্মকান্ড থেকে শুরু করে, স্থানীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সবকিছুর দায়িত্ব ও জবাবদিহির চর্চা সরকারকে দিয়ে করালে কেন্দ্রীয় সরকার অনেকটা চাপমুক্ত থাকবে। স্থানীয় সরকারের আয়ের উৎসগুলোও তাদের নিজস্ব ভাবে করে নিতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত থাকবে। স্থানীয় সরকারের পরিষেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। যেসব স্থানীয় সেবা স্থানীয় সরকার দিতে পারে, সেগুলোর দায়িত্ব তাদের ওপরই থাকা ভালো। এভাবে প্রশাসনিক কাজের বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব। স্থানীয় সরকার জনগণের সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায়ও সংস্কার জরুরি। যেমন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ব্যবস্থায় ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হয়ে আসেন নয়জন সদস্য। দেখা যায় গোটা এলাকা থেকে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এক ইউনিয়নে সব ওয়ার্ড থেকে মাত্র একজন নারী সদস্য নির্বাচিত হন। এমন অসম বণ্টন নিঃসন্দেহে প্রীতিকর নয়। নারীদের নির্বাচন করতে হয় প্রতি তিন ওয়ার্ড থেকে। পুরুষরা আলাদা নয় ওয়ার্ড থেকেই নির্বাচিত হতে পারেন। নারী সদস্যরা আনুপাতিক হারে কম নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীদের তাই ব্যাপক সংগ্রামের মধ্যে থাকতে হয়। এজন্য এ সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতা অবারিত করে দেওয়া যেতে পারে। অথবা একটি ওয়ার্ডে নারী প্রার্থীদেরই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে।

প্রতিবার নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনকে এগুলো নির্ধারণ করে দিতে হবে। প্রতিবারই এক ওয়ার্ড নির্দিষ্ট থাকবে এমন নয়। নারীদের স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়টিতেও বাড়তি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ভাবা দরকার বলে মনে করি। ইউনিয়ন পরিষদকে স্বশাসিত করা জরুরি। তাদের অর্থ দিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তাদের সরকার যে অর্থ বরাদ্দ দেবে তার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পরবর্তী বছর বরাদ্দ পাবে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো সুযোগ সরকারের হাতে থাকে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারকে নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সে আয়ের ভিত্তিতেও স্থানীয় সরকার কিছু কিছু জায়গায় কাজ করবে। ফলে স্থানীয় সরকারও এক ধরনের বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসন হয়ে উঠবে। দেশে ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন রয়েছে। অর্থাৎ তালিকা অনেক দীর্ঘ। এ দীর্ঘ প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করা জটিল। এ জটিল প্রক্রিয়াটি সফল করার জন্যই স্থানীয় স্বশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। স্বরাষ্ট্র, কর আদায় বা কিছু জরুরি বিষয় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হাতে থাকতে পারে। কিন্তু জনগণের পরিষেবা থেকে শুরু করে স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত করে দিয়ে জবাবদিহির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি তা করা যায়, তাহলে স্থানীয় সরকার নিজেদের মতো গড়ে উঠতে থাকবে। তারা এর প্রক্রিয়াও সুগম করার জন্য আগ্রহী হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এ ব্যবস্থা যেন ভেঙে দেওয়া না হয়। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আমরা পাইনি। অথচ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থানীয় সরকার। বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়া দুঃখজনক। উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায়ও সংস্কার আনতে হবে। এখানে নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যারা সদস্য হন তাদের সঙ্গে উন্নয়নমূলক সংস্থায় জড়িত সাবেক কর্মকর্তাদের সংযুক্ত করা যেতে পারে। তারা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন। এ ব্যবস্থা আছে।

ইউনিয়ন পরিষদে নারী ও পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদের কার্যকারিতা নেই। যেখানে স্থানীয় সরকারের এমন পদে কার্যকারিতা এর বিলোপও জরুরি। স্থানীয় সরকারকে মসৃণভাবে পরিচালনার জন্যও সংস্কার করতে হবে। যদি সংস্কার না করা হয়, তাহলে এ ব্যবস্থারই বিলোপ করে দেওয়া উচিত। কারণ স্থানীয় সরকারের পেছনেও খরচ রয়েছে এবং এ ব্যবস্থা সরকারের বর্ধিত অংশ হিসেবে কাজ করলে রাষ্ট্রের বৃহত্তম কোনো স্বার্থই উদ্ধার হবে না। স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন সময়ের দাবি। স্থানীয় সরকার হোক স্বশাসিত। স্থানীয় সরকার কাঠামো সুসংহত করতে, আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিগত সরকার এ বিষয়ে নজর দেয়নি। বরং বলা ভালো অনেকটা ইচ্ছা করেই তারা এ ব্যাপারে উদাসীন থেকেছে। কারণ এর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক হীনস্বার্থ ছিল। তবে এবার বিএনপি সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের হাতে সময় আছে একটি দৃষ্টান্তমূলক স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন আয়োজনের। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে ঢেলে সাজানোরও সুযোগ তাদের সামনে রয়েছে। সেটি কতটা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com