

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক গতিপ্রবাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত ও মরিশাস সফর বলা যায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল ও বাস্তবভিত্তিক ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রয়াস হিসেবেও দেখা যায়। দিন-তারিখ, বক্তব্য, বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে এই সফর বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—বাংলাদেশ এখন সম্পর্ককে আবেগ নয়, বরং প্রয়োজন ও সম্ভাবনার নিরিখে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে চাইছে।
১০ এপ্রিল ২০২৬—এ সময় পর্বে ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। বৈঠকটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবে এর সময়কাল ও প্রেক্ষাপট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর ঠিক আগেই ভারত সফর শেষে দেশে ফিরেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে এ বৈঠককে বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে দেখা যায়, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্কগুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে, ১০ এপ্রিলের আশপাশে—ভারতে তিন দিনের সফর সম্পন্ন করেন খলিলুর রহমান। এ সফরে তিনি দিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে। এ বৈঠকগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ফের আলোচনায় আনা এবং সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা।
১২ এপ্রিল ২০২৬—মরিশাসে অবস্থানকালে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খলিলুর রহমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ সম্পর্ক নতুন করে শুরু হচ্ছে না; বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এ ধরনের সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী কার্যক্রম কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করে। এগুলো সরাসরি কোনো চুক্তি বা সমঝোতা তৈরি না করলেও পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে সহায়ক হয়।
জ্বালানি সহযোগিতা এ সফরের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ভারত কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে—তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জ্বালানি সংকটের সময় বাংলাদেশ অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভারত দ্রুত সাড়া দেয়। বর্তমানে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
বস্তুত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। ২০২৬ সালের এ সংকটে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর কারণে বাংলাদেশ বিশেষভাবে চাপে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে আসে। চলতি মার্চ ও এপ্রিল মাসে কয়েক দফায় ভারত থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে। মার্চ মাসে একাধিক চালানে মোট প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসেছে এবং এপ্রিল মাসে আরও প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটজনিত অনিশ্চয়তার সময় ভারত থেকে ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এটি দেখায়, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা রয়েছে এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে এ জ্বালানি সরবরাহ আরও সহজ ও কার্যকর হয়েছে। সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আসায় পরিবহন ব্যয় কমছে এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
পানি বণ্টন—বিশেষ করে গঙ্গা নদীর পানি—এ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এ প্রেক্ষাপটে চুক্তির নবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।
ভিসা ব্যবস্থা ও মানুষে মানুষে যোগাযোগের বিষয়টিও এ সফরে গুরুত্ব পেয়েছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক ভিত্তি। সরকারি পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি এ ধরনের যোগাযোগই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়—সব ক্ষেত্রেই এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মরিশাসে অনুষ্ঠিত ভারত মহাসাগর সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। মরিশাসে আয়োজিত এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিকটিকেও সামনে নিয়ে আসে।
এ সম্মেলনে সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়, ফলে এই পথ খোলা ও নিরাপদ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্পর্কের ‘রিসেট’ বা পুনর্গঠনের ধারণা। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে একটি শীতলতা তৈরি হয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে এ সফরকে একটি ফের সংলাপ শুরু করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ও সময় প্রয়োজন। এটি একদিনে সম্ভব নয়; বরং ধীরে ধীরে আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে এগোতে হবে।
সব মিলিয়ে, খলিলুর রহমানের ভারত ও মরিশাস সফর একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট—সবকিছুই একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ সফরের বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশ এখন তার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী অবস্থান নিতে চায়। সম্পর্ককে আবেগ বা অতীতের ধারাবাহিকতায় না রেখে বর্তমান প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এ প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের পদক্ষেপগুলোর ওপর। তবে এ সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—যেখানে সংলাপ, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট