

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে চীনের রপ্তানি ৫৩ শতাংশ কমে যাওয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো নতুন সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, যা দেশের পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এ অবস্থান ধরে রাখা এবং আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, নীতি সহায়তা এবং কাঠামোগত সংস্কার।
অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। যদিও এ রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম, তবু চীনের তুলনায় কম ক্ষতি হওয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতি, যার ফলে চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সময়ে ভারতের রপ্তানিও ২৭ শতাংশ কমেছে। ফলে বাজারে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। তবে এ সুযোগকে স্থায়ী সাফল্যে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে শুধু প্রতিযোগীদের দুর্বলতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নিজেদের সক্ষমতাও দ্রুত বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো প্রধানত নিম্ন ও মধ্যম মূল্যের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিশ্ববাজার ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের, টেকসই এবং প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। তাই পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজন বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ডলার অস্থিরতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এ খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলছে। সময়মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই শিল্পাঞ্চলগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সুযোগ হলো, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদন। বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রিন গার্মেন্টস কারখানা বাংলাদেশে রয়েছে। এ শক্তিকে আরও কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে হবে। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও শ্রমমানকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। শ্রমিক অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বাজার দখল করতে পারবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধানও জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার গুরুত্বপূর্ণ হলেও একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং পূর্ব ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা বাড়ছে। সরকার ও উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করতে হবে।