রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০১:০৯ অপরাহ্ন

বিশ্ব বাবা দিবস আজ

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ২ বার

বাবা শব্দটি ছোট, তবে এর অর্থ অনেক বিস্তৃত। বাবা শব্দের মাঝেই জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, মায়া, নির্ভরতা। আর তাই প্রত্যেক বাবাকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় ‘বিশ্ব বাবা দিবস’।

আজ রোববার (২১ জুন) বিশ্ব বাবা দিবস। সন্তানের জীবনে শক্তি, সাহস ও নির্ভরতার প্রতীক বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিনটি।

একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম নায়ক এবং জীবনের কঠিন সময়ে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা ও আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার নেপথ্য কারিগর এই মানুষটিই।

মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ্য, দৃশ্যমান। কিন্তু বাবার ভালোবাসা অনেকটা নদীর গভীর স্রোতের মতো— নিঃশব্দ, অথচ প্রবল। তিনি হয়তো খুব কম বলেন, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পরিশ্রম, প্রতিটি দুশ্চিন্তার ভেতর লুকিয়ে থাকে পরিবারের প্রতি অসীম দায়িত্ববোধ।

বিশ্ব বাবা দিবসের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রে। বাবা দিবসকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে সনোরা স্মার্ট ডড নামে এক নারীর। ১৯০৯ সালের আগে ওয়াশিংটনে বাবা দিবস বলে কোনও বিশেষ দিন ছিল না। সে সময় স্থানীয় গির্জায় ডড মা দিবস পালনের কথা শোনেন। মা দিবস পালনের রীতি রয়েছে কিন্তু বাবা দিবস পালনের রীতি নেই জেনে তিনি ভীষণ অবাক হন। তারপর তিনি বাবা দিবসের স্বীকৃতির জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ডড তার বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। মা ছিল না তার। মায়ের মৃত্যুর পর শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও তাদের সাত ভাইবোনকে বড় করে তুলেছিলেন তাদের সিঙ্গেল বাবা। বাবার এই ত্যাগ দেখে ডডের মনে হলো, মা দিবসের এত আয়োজন হলে বাবা দিবস কেন বাদ থাকবে। বাবাকে সম্মান জানানোর জন্যও একটা দিন থাকা দরকার।

তারপর অনেক চেষ্টা করে দীর্ঘ এক বছরের সাধনায় স্থানীয় কমিউনিটিগুলোতে বাবা দিবস পালন করতে পারেন ডড। ১৯১০ সালের ১৯ জুন বিশ্বে প্রথমবারের মতো পালিত হয় বাবা দিবস।

বিশেষ এই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসার বার্তায় ভরে উঠেছে মানুষের টাইমলাইন। কেউ তুলে ধরছেন বাবার সংগ্রামের গল্প, কেউ আবার জানাচ্ছেন কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে নিয়ে ছবি, স্মৃতি আর আবেগঘন কথার ভিড়ে হয়তো অনেকেই বাবাকে নতুন করে ভাবছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমরা কি সত্যিই বাবাকে বুঝতে পারি? সংসারের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটিকে আমরা কতটা দেখি?

বাংলা সমাজে বাবাদের একটি অদ্ভুত চরিত্র দেখা যায়। তারা নিজের কষ্ট খুব কমই প্রকাশ করেন। সংসারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, ভবিষ্যতের চিন্তা, চিকিৎসা কিংবা সামাজিক দায়িত্ব— সবকিছু নিজের কাঁধে নিয়ে নীরবে চলতে থাকেন। অনেক সময় পরিবারের মানুষ বুঝতেও পারেন না, একজন বাবা কতটা চাপের মধ্যে দিন কাটান।

আমাদের আশপাশে এমন অসংখ্য বাবা আছেন, যারা নিজের ইচ্ছা-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন গড়ে তুলেছেন। হয়তো নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনেননি, কিন্তু সন্তানের বই কিনতে কার্পণ্য করেননি। হয়তো নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু সন্তানের কোচিং ফি ঠিকই দিয়েছেন। এই আত্মত্যাগের হিসাব কোনো দিন লেখা হয় না।

বাবাদের আবেগ নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের নীরব নিষেধাজ্ঞাও আছে। ছোটোবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়— পুরুষ মানুষ কাঁদে না। ফলে একজন বাবা নিজের ভয়, ব্যর্থতা কিংবা মানসিক ক্লান্তি কাউকে বলতে পারেন না। সংসারের সামনে তাকে সব সময় দৃঢ় থাকতে হয়। অথচ তিনিও মানুষ। তারও ক্লান্তি আছে, ভাঙন আছে, না বলা কষ্ট আছে।

একসময় পরিবারে সন্ধ্যার আড্ডা ছিল, একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস ছিল। এখন সবাই ব্যস্ত নিজের স্ক্রিনে। ফলে বাবার নীরব উপস্থিতিটাও অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়।

বিশ্ব বাবা দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার দিন নয়; এটি একজন বাবার নীরব অবদানকে স্বীকার করার দিন। যে মানুষটি হয়তো কখনও বলেননি ‘আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, কিন্তু প্রতিটি কাজে তা প্রমাণ করেছেন।

আমাদের সমাজে বাবা-মাকে নিয়ে আবেগ প্রকাশের সংস্কৃতি খুব বেশি নেই। বিশেষ করে বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে অনেকেই সংকোচবোধ করেন। অথচ একটি ফোনকল, একটি ধন্যবাদ, কিংবা পাশে বসে কিছু সময় কাটানো— এগুলোই একজন বাবার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে।

যাদের বাবা বেঁচে আছেন, তারা হয়তো আজ একটু সময় দিতে পারেন। বাবার সঙ্গে বসে কথা বলতে পারেন, জানতে পারেন তিনি কেমন আছেন। আর যাদের বাবা নেই, তাদের জন্য দিনটি স্মৃতির। হয়তো পুরোনো কোনো ছবি, কোনো উপদেশ কিংবা শৈশবের কোনো মুহূর্ত আজ নতুন করে মনে পড়বে।

বাবারা সাধারণত জীবনের শেষ বয়সে সবচেয়ে বেশি একাকী হয়ে পড়েন। সন্তান বড় হয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, সংসারের ব্যস্ততা বাড়ে। কিন্তু যে মানুষটি একসময় পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন, তিনিই ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যান। এই বাস্তবতা আমাদের ভাবায়।

বিশ্ব বাবা দিবসে তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট নয়, প্রয়োজন সম্পর্কের পুনর্জাগরণ। বাবাকে বোঝা, তার ক্লান্তি উপলব্ধি করা, তার নীরব ভালোবাসাকে সম্মান করা— এটাই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা। কারণ পৃথিবীর অনেক সম্পর্ক শব্দে প্রকাশ পায়, কিন্তু বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় দায়িত্বে। আর সেই দায়িত্বের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক অনন্ত ভালোবাসার গল্প।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com