

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্র সংসদ ভবন এলাকা।আজ সোমবার নিষেধাজ্ঞা ও ব্যারিকেড উপেক্ষা করে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী এবং তরুণ রাজপথে নেমে এলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানেগ্যাস ছোড়ে পুলিশ।
এ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
মূলত ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা ‘নীট’ অনিয়মের অভিযোগে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ডাক দেয়। তবে দিল্লি পুলিশ এই মিছিলের অনুমতি দেয়নি এবং রাস্তা ব্যারিকেড করা ও দাঙ্গা-নিয়ন্ত্রণকারী যানবাহন মোতায়েন করাসহ মধ্য দিল্লিজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এদিন সকাল থেকে বিক্ষোভ করছিল ককরোচ জনতা পার্টি। কিছু সময় পরই দলটির সমর্থকরা আচমকা পদযাত্রা শুরু করেন সংসদ ভবনের দিকে। সেখানে চলছিল বাদল অধিবেশন। তাতেই ধুন্ধুমার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সংসদ ভবন চত্বরে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ককরোচ পার্টির পক্ষ থেকে এক জরুরি বার্তায় সমর্থকদের শান্ত ও অহিংস থাকার আকুল আবেদন জানানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আপনাদের যদি বিভিন্ন পয়েন্টে আটকে দেওয়া হয়, তবুও শান্ত থাকুন ও শান্তি বজায় রাখুন। আমরা কেবল শান্তি ও ভালোবাসার পথেই জয়ী হতে পারব।
ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ ভবন অভিযানে শুরু থেকেই মারমুখী ভূমিকায় পুলিশ। তারা লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ওপর। পাল্টা পুলিশকে তাড়া করেন বিক্ষোভকারীরা। এসময় বিক্ষোভকারীদের আটকাতে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। ব্যবহার করা হয় জল কামানও। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের আটকানোরা চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ভেঙে ফেলা হয় ব্যারিকেড।
দিল্লির সংসদ ভবনের চারপাশের সুরক্ষা বলয় এলাকায় কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জমা হন সেখানে। এরপর যন্তর মন্তর, কনট প্লেস, রেল ভবন, শাস্ত্রী ভবন এবং জনপথের বিভিন্ন অংশসহ একাধিক জায়গায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ বাঁধে।
আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠলে বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের কাছাকাছি চরম সুরক্ষিত এলাকায় বসানো একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরই দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী এবং পুলিশের সদস্য আহত হয়েছেন।
বিশাল বিক্ষোভকারী দলের মুখোমুখি বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভিড়ের একাংশ ব্যারিকেড ভেঙে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করলে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ার আগে কর্তৃপক্ষ বারবার তাদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার অনুরোধ জানায়। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীরা যাতে কোনোভাবেই সংসদ ভবনের দিকে এগোতে না পারে, সেজন্য নিরাপত্তা কর্মীরা ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আরও জোরদার করে। এ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মধ্য দিল্লির বেশকিছু এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গতকাল রোববার দিল্লি পুলিশ এই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি এবং এলাকায় বড় ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লির পাঁচটি মেট্রো স্টেশন, রাজীব চক, জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট এবং সেবা তীর্থ বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে রাজধানীর বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনে যাত্রীদের ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
এর আগে শনিবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যখন সিজেপি-সমর্থিত আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২১ দিন ধরে অনশনরত শিক্ষাবিদ ও কর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালেও তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, একদিকে আজ যখন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন ককরোচ জনতা পার্টির সদস্যরা, তখন দিল্লির যন্তর মন্তরে কেরালা হাউসের সামনে পুলিশের দ্বারা সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর ওপর পুলিশি হেনস্থার অভিযোগ। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এই কথা জানিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস।
এ ছাড়াও তিনি বেলা তিনটার দিকে এক্স-এ লেখেন, মুখ্য আন্দোলনকারী অভিজিৎ দীপককে পুলিশ ‘তুলে নিয়েছে’, অবশ্য পরে তিনি জানান, অভিজিৎ দীপককে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। কেরালা হাউসের সামনে বহু মানুষের জমায়েত হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলেন সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। তিনি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দাবি করেছেন। দুপুর ১২টার দিকে ককরোচ জনতা পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌরভ দাস এক্স-এ জানান, তারা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন।
শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার কাছে হলফনামা জমা দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিরা।
আলোচনায় রাজি হওয়ায় সোনাম ওয়াংচুক অভিজিৎ দীপককে অনুরোধ করেছেন তার অনশন ভঙ্গ করার জন্য। সোনাম ওয়াংচুককে ধর্ণাস্থল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করার পর থেকেই অনশনে বসেছিলেন অভিজিৎ দীপক। যদিও সোনাম ওয়াংচুকের অনশন এখনও চলছে বলেই জানিয়েছেন তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো।
প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে গীতাঞ্জলি আংমো বলেন, ‘এই সরকার জনবিরোধী, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলবে।’
সম্প্রতি ভারতের চিকিৎসাক্ষেত্রে ভর্তির পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় সারাদেশ থেকে ২১ জন ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার খবর মিলেছে। ফলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে আন্দোলন শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের সমর্থন দিয়ে অনশনে বসেন শিক্ষকর্মী ও পরিবেশ বিষয়ক আন্দোলনকারী সোনাম ওয়াংচুক।