

চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরুর সময় ভূপাতিত ইরানি বিমানের কোনো পাইলটকে গোপনে আটক রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে কাতার। শনিবার এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি ইরানি কর্মকর্তাদের এমন দাবিতে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানি পাইলটদের আটকের বিষয়ে প্রচারিত দাবিকে কাতার ‘দৃঢ়ভাবে অস্বীকার’ করছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের ‘বিভ্রান্তিকর বক্তব্য’ খুবই বিস্ময়কর। কাতারের বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।
এর আগে তেহরান ওই পাইলটদের মুক্তির দাবি জানায়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরজাদেহ আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে দাবি করেন, মার্চে কাতারের কাছে সু-২৪ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর তিন পাইলট- জাভাদ সালেহি, আবদোলমাজিদ দাশতিয়ান ও ওমরান বেহরাভেশিয়ান জীবিত অবস্থায় আটক হন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই তিন পাইলটকে ছয় মাস ধরে পরিবারের সদস্য ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে গোপনে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক হস্তক্ষেপেরও আহ্বান জানান বাঘেরজাদেহ।
তবে কাতারের দাবি, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী মার্চে কাতারের আকাশসীমায় অনুমোদনহীনভাবে প্রবেশ করা ইরানি বিমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। সতর্কবার্তায় কোনো সাড়া না পাওয়ার পর বিমানগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
পরে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল একজন পাইলটের মরদেহ উদ্ধার করে। তার নাম মাজিদ কাজেমি। কাতার জানায়, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান অনুযায়ী মরদেহটি ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল।
আল-আনসারি আরও জানান, এপ্রিল মাসে উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলকে কাতারে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ইরান এখনো ওই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি।
ইরানি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনাটি কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলার সময় ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক স্থাপনা এই ঘাঁটিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সদস্যরা অবস্থান করেন।
মার্চের শুরুতে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তাদের বাহিনী দুটি ইরানি সুখোই সু-২৪ বোমারু বিমান ভূপাতিত করেছে। চলমান সংঘাতের মধ্যে কোনো উপসাগরীয় দেশ কর্তৃক ইরানি সামরিক বিমান ভূপাতিত করার এটিই ছিল প্রথম প্রকাশ্য দাবি।
২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা বাড়তে থাকে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও জুনে শান্তি কাঠামো নিয়ে আলোচনা ভেঙে পড়ে। এরপর হরমুজ প্রণালির আশপাশে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং আঞ্চলিক নৌপথ ও অবকাঠামোয় নতুন করে হামলা শুরু হয়।
ইরানি পাইলটদের আটকের অভিযোগ নিয়ে কাতার ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হলেও, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে দোহা।
এদিকে মধ্য জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অধীনে নির্ধারিত ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা সোমবার শেষ হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা খুব সীমিত হওয়ায় শান্তি প্রচেষ্টা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
শুক্রবার নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘খুব খারাপভাবে পরাজিত’ হচ্ছে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ ঘোষণা করতে পারেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য শনিবার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এক্সে বলেন, একটি পোস্ট কিংবা বিমানবাহী রণতরী দিয়ে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়। ওয়াশিংটন ‘পরাজয়ের বাস্তবতা’ মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ইরান প্রণালিতে তাদের অবরোধ কার্যকর রাখবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ফলে ইরানি পাইলটদের আটকের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাতার-ইরান কূটনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ঘিরে আঞ্চলিক সংকটও আরও জটিল হয়ে উঠছে।