

অনুমোদিত সীমার বাইরে গোপন গুদামে শুল্কমুক্ত মদ মজুদ রাখার অভিযোগে ব্যবসায়ী শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এর চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করেছে যৌথ তদন্ত দল। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর দক্ষিণ গুলশানে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১ (এসআরবি-১)-এর এক যৌথ অভিযানে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিটি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর সাড়ে চারটা পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউসগুলোর কার্যক্রমে গুরুতর অসংগতি শনাক্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নথিভুক্ত ও ঘোষিত অনুমোদিত ওয়্যারহাউসের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। তবে সরেজমিন অভিযানে দেখা যায়, তারা অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে মোট চারটি গুদামে পণ্য মজুদ করে রেখেছিল। বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত শুল্কমুক্ত পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা বা খোলাবাজারে বিক্রির আশঙ্কা রোধ এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দুটি বৈধসহ চারটি ওয়্যারহাউসই তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, এই অভিযান সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। নুর ইসলামের ব্যবসা ও কর ফাঁকির বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনেক আগে থেকেই অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। তবে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার পর সালমান মুক্তাদির লাইভে এসে রাজনৈতিক মহলের চাঁদাবাজিকে দায়ী করা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মন্তব্য করার পর থেকে পরিবারের ওপর নজরদারি ও সার্বিক প্রক্রিয়ার গতি কিছুটা বেড়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অভিযানকালে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনুমোদিত সফটওয়্যার এবং গুদামে সংরক্ষিত পণ্যের সরেজমিন তথ্য যাচাই করেন। এ সময় সফটওয়্যারে এক্সবন্ড দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউসে থাকা ১৪৪ ক্যান বিয়ার, ১২ বোতল হুইস্কি এবং ৬ বোতল নিমিরফ পাওয়া যায়। অর্থাৎ সফটওয়্যারে পণ্যগুলো প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড় হয়েছে বলে দেখানো হলেও সরেজমিনে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের হেফাজতে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া, আমদানিকৃত ২,২৫০ কার্টন হেনিক্যান বিয়ার প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার সিস্টেমে ৩-০৯-২০২৬ তারিখে ইনবাউন্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। কিন্তু যৌথ অভিযানে যাচাই করে দেখা যায়, উক্ত পণ্যগুলো প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউসে বাস্তবে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের মোট চারটি ফ্লোরের মধ্যে দুটি ফ্লোরের কাস্টমসের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য বা অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
ডিএনসির নেতৃত্বে পরিচালিত যৌথ অভিযান প্রসঙ্গে ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ওয়্যারহাউসটি নুরুল ইসলামের মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এই অভিযানটি চালানো হয়েছে। অসঙ্গতি ও অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউস সিলগালা করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, টস বন্ড মূলত বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য শুল্কমুক্ত অ্যালকোহল সরবরাহের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে শুল্কমুক্ত মদ খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখছিল এনবিআর। এর পাশাপাশি এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডা থেকে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের আর্থিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেখানে নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের কানাডার নাগরিকত্ব এবং অন্তত চারটি কোম্পানির মালিকানার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা দেশের কর নথিতে গোপন রাখা হয়েছিল। ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাদের ১৬৩টি আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এক বছরে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আনার তথ্যও মিলেছে।
উল্লেখ্য, নিউ গিনি প্রোপার্টিজ এলাকায় হামলার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার দায়ের করা জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সাতজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যেই গত বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত সব ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর পরদিনই তার শ্বশুরের প্রতিষ্ঠানের অবৈধ ওয়্যারহাউসে যৌথ বাহিনীর এই বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হলো।