

স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন উপযোগী। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসকের মাধ্যমে চলছে নাগরিকসেবা কার্যক্রম। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না সাধারণ জনগণ। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী আগামী নভেম্বরে প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। পরে বার্ষিক পরীক্ষাসহ নানা কারণে পিছু হটতে হয়েছে ইসিকে। এখন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ফের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। সেক্ষেত্রে আগামী নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা করে জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপ আয়োজন করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, জানুয়ারিতে ভোট শুরু করার চিন্তা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে নভেম্বরে তফসিল হতে পারে। সরকারের চাপে ইউপি ভোট নিয়ে ইসির পরিকল্পনা থেকে পিছিয়েছে কিনা জানতে চাইলে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, মোটেই না। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া যাতে বিঘ্ন না হয় সেটা বিবেচনা করে আমাদের পরিকল্পনা একটু পরিবর্তন হয়েছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার বিকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে এবং তা ৬ জুন পর্যন্ত চলবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করতে হবে।
এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছিলেন, ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়- প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে।
পরের দিন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের এ বিষয়ে কোনো চিঠি-চালাচালি হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনাও হয়নি।
এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পরীক্ষার কারণে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোট না করার পরামর্শ আসে। সভায় আলোচনায় উঠে আসে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততার মধ্যে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউপি নির্বাচন করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ইসির পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসছে। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সভা বাতিল করে ইসি। ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘোষিত ৩ দিনের সংলাপও স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতির মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভোটার স্থানান্তর বন্ধ করা হয়েছিল, ২৩ সেপ্টেম্বর ফের ভোটার স্থানান্তর কার্যক্রম চালু করেছে ইসি।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম বলেছেন, নির্বাচন বিলম্বিত হওয়াটা ঠিক হয়নি। এতে সরকার, দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্থানীয় সরকার থেকে সেবা নিচ্ছে সাধারণ মানুষ, সার্ভিস দেয় ক্ষমতাসীন দল- এই এজেন্ডা স্থানীয় সরকার পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। কাজেই মানুষের সমস্যা, সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন বিলম্ব হবে।
ভোটের তারিখ চূড়ান্তে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সমন্বয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের ‘গ্যাপ’ না হওয়াই ভালো। সরকার-ইসির এ ধরনের গ্যাপ ভোটার, মানুষকে নেতিবাচক বার্তা দেয়। সংসদ নির্বাচনের মত স্থানীয় নির্বাচনে যদি সরকার সহযোগিতা দেয়, তাহলে সামনেও ভালো নির্বাচন হবে আশা করি।
গত বৃহস্পতিবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, বাস্তবতা বুঝে ভোট আয়োজন করবে কমিশন ইসি। এ জন্য যেখানে যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তাই নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচনের কথা বলেছেন, আপনারা কী ভাবছেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, এখনও পর্যন্ত কমিশন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। আপনারা জানেন যে ১৭ সেপ্টেম্বর একটা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন ধরনের মতামত দেওয়া হয়েছে। সময়সূচির ব্যাপারেও আলোচনা করা হয়েছে এবং আমাদের যে সম্মানিত সহকর্মীরা আছেন, তারা বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। কাজেই ওই প্রস্তাবের ওপর তো আমার মনে হয় না যে, আমরা একটা কনক্লুসিভ সিদ্ধান্তে যেতে পারি।
ইসি সচিব আরও বলেন, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম যেটা বলেছেন, জানুয়ারি থেকে জুনের কথা বলেছেন, ভালো একটা রেফারেন্স তো পাওয়াই গেল। তাহলে রেফারেন্স পাওয়া গেলে সেভাবে আমরা হয়তো বাকি কাজগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাব। যেহেতু আজকে কথা বলছেন, ইটস টু আর্লি ফর মি টু কমেন্ট। বাট আমার মনে হয় যে এটা কমিশনে আমি জানাব, আপনাদের রেফারেন্সেই জানাব।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল ইসি। এতে ভোটার দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। ভোটগ্রহণের সময় পরিবর্তন হওয়ার নতুন করে হালনাগাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের মধ্যে ৬৩টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৪ হাজার ৫৮১টি ইউপি রয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের এপ্রিল, নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ইউনিয়ন পরিষদে সাত ধাপে ভোট হয়েছিল। ফলে অধিকাংশ ইউপির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এদিকে ইউপি ছাড়া পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ২০২৪ সালের আগস্টে অপসারণ করা হয়। এরপর সেখানে প্রশাসক নিয়োগ হয়। স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ পদই এখন নির্বাচন উপযোগী রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পরিষদের মেয়াদ পর্যায়ক্রমে শেষ হওয়ায় ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করবে ইসি।