

দশকের পর দশক ধরে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় আলাদা করে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাদের দাবি ছিল, তারা শুধু ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিই নয়, বরং ভিন্ন এক নৈতিক দিকনির্দেশনাও উপস্থাপন করে। দলটি নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ, ধর্মপরায়ণ এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে থাকে। সম্প্রতি একের পর এক ঘটনায় দলটির আদর্শিক দাবি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সবশেষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মারধরের হুমকি, গালাগাল ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা; ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জামায়াতের এক এমপির জামাতা গ্রেপ্তার, নৈতিক স্খলনের দায়ে দল থেকে বহিষ্কারের পরও গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা এবং দলের এমপিদের ত্রাণ নিয়ে অনিয়মের মতো ঘটনা এখন রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পেয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি জামায়াতের জন্য নতুন কোনো সংকট নয়। অতীতেও দলের নেতাদের বক্তব্য বা আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রতিবারই দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে প্রতিষ্ঠানের আদর্শের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতের
দায়িত্বশীলদের মানবিক গুণ ও উন্নত নৈতিক মানে সেরা হতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ নেই।
গত বৃহস্পতিবার মদিনা-ঢাকা ফ্লাইটের লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আখতারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’ এবং ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’। একই সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী সম্পর্কেও অশালীন মন্তব্য করেন তিনি। পরে নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের সঙ্গে বাগ্?বিতণ্ডা এবং তাকে শারীরিক লাঞ্ছনা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনগত পদক্ষেপের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে নাগরিক হয়রানির প্রতিবাদ করায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেছেন, সামান্য ও ঠুনকো অজুহাতে খ্যাতিমান বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অশুভ লক্ষণ। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার মেজর (অব.) আখতারুজ্জমানের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলের পক্ষ থেকে।
এর আগে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. আবদুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানের নাম সামনে আসে। এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তারের পর আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলায় হামলা, গুলি, মারধর ও মালামাল লুটের অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত এবং অস্ত্র ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। জমির দখল-বেদখল নিয়ে বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত কিনা, সেটিও তদন্তে দেখা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিষয়টি। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে ২২ জুলাই তাকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরদিন দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পিকারকে জানানো হয়। কিন্তু বহিষ্কারের পরও সংসদ সদস্য পদটি বহাল রয়েছে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম গ্রেপ্তার হন। ৩০ সেপ্টেম্বর মাকছুদা জামিন পেলেও গাজী নজরুলের জামিন হয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতের নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান (বাচ্চু), রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন এবং খুলনা-৬ আসনের এমপি আবুল কালামের বিরুদ্ধে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রত্যেককে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত কখনই নিজেদের কেবল আরেকটি রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং তারা ভোটারদের কাছে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে, যারা অন্যদের তুলনায় উচ্চতর নৈতিক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিকালে দলটির নেতাদের নানা ধরনের অনৈতিক ঘটনার খবর তাদের দাবির সঙ্গে মাননসই নয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খান জামায়াত নেতাদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনারা ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছেন।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপিকে পদত্যাগ করিয়েছে। বিপরীতে জামায়াতের একজন এমপি দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও তার সংসদ সদস্য পদে বহাল রয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জামায়াত চাইলে গাজী নজরুলের পদত্যাগের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে পারত। এ ছাড়া মেজর (অব.) আখতার যা করেছেন, তা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আমাদের সময়কে বলেন, ইসলামের আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াত। তাই শৃঙ্খলা ও নৈতিক বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি। তবে বিমানবন্দরের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত।
দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, কোনো এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা হলো বহিষ্কার। গাজী নজরুলের ক্ষেত্রেও সেটিই করা হয়েছে এবং স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে দলের করণীয় নেই বলেও তিনি জানান।