সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪২ অপরাহ্ন

এক কাপ চায়ের জন্য নিভে গেল ১০ প্রাণ

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার

এক কাপ চা তৈরির সময় কর্মচারীর অবহেলায় জীবন্ত দগ্ধ হয়েছে ১০টি তরতাজা প্রাণ! কক্সবাজারের ইনানীতে বাঁশ ও কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টটি মূলত ছিল চরম অব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলা ভয়ংকর ‘মৃত্যুফাঁদ’। সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিন তলা ওই রিসোর্টে ওঠানামার একমাত্র কাঠের সিঁড়ির একপাশে রান্নাঘর, অন্যপাশে ডিজেল চালিত জেনারেটর রুম। ফলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ডিজেলের আগুন ধরে যাওয়ায় নিচতলার নামার একমাত্র পথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন প্রাণ বাঁচাতে নিচে নামার সুযোগই পাননি পর্যটকরা। কোনো ইমার্জেন্সি এক্সিট ব্যবস্থা ছাড়াই গড়ে তোলা এই দাহ্য স্থাপনায় কীভাবে চোখের পলকে নেমে এসেছিল নরককুন্ডের বিভীষিকা, তার রোমহর্ষক চিত্রই উঠে এসেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, ‘রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। তারা দায় এড়াতে পারে না। তদন্ত শেষ করে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করব।’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা উন্নয়নের পরিচালক লে. কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘আগে থেকেই রিসোর্টটিকে ঝুঁঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গত জুনে পরিদর্শনের পর দেওয়া হয়েছিল নোটিস। তারপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তাদের ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা সনদ। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও ফায়ার অ্যালার্মসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিও ছিল।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, শনিবার সকালে ৬টার দিকে টুপটুপ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম সুমন ওয়েটার কপিলকে চা তৈরির নির্দেশ দেন। ব্যবস্থাপকের নির্দেশনা পেয়ে গ্যাসের চুলায় চায়ের জন্য পানি বসিয়ে বাইরে হাঁটতে যায় কপিল। এর মধ্যে কেটে যায় এক ঘণ্টা। এ সময়ের মধ্যে পানি শুকিয়ে পাতিলটি অগ্নিকুন্ডে পরিণত হয়। একপর্যায়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় গ্যাস সিলিন্ডারটি। এর সঙ্গে সঙ্গে রুম লাগোয়া জেনারেটরের জন্য আনা ডিজেলের সংস্পর্শে এসে দ্রুততা আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় ১০টি তাজা প্রাণ।

গতকাল সকালে কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে গিয়ে দেখা যায়- রিসোর্টের উত্তর-পূর্ব পাশের অংশে ছিল কিচেন ও জেনারেটর রুম। মাঝখানে তিন তলা রিসোর্টের চলাচলের একমাত্র কাঠের সিঁড়ি। এ সিঁড়ি বেঁয়েই রিসোর্টের পর্যটক ও কর্মীরা চলাচল করতেন। এ রিসোর্টে ছিল না কোনো জরুরি বর্হিগমন পথ। ছিল না অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম। রিসোর্টটি বাঁশ, কাঠ এবং ছন দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন লাগার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভবনটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। আগুনের সূত্রপাত নিয়ে স্থানীয় যুবক মো. জালাল দিয়েছেন বিস্ফোরক তথ্য। তিনি বলেন, ‘ওয়েটার কপিল চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে বাইরে চলে যায়। অনেক সময় পার হওয়ায় আগুনে পানি শুকিয়ে চায়ের পাতিলটি অগ্নিকুন্ডে পরিণত হয়। একপর্যায়ে গ্যাসের সিলিন্ডারের নলে ফেটে আগুন ধরে। কিচেন ও জেনারেটর রুমের মাঝে একমাত্র সিঁড়ি। ওপরের লোকজনের নিচে নামার মতো বিকল্প কোনো পথ ছিল না। ওপরে ২৬ জন ও নিচে ২৭ জন ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘১৫ থেকে ২০ ফুট জায়গার মধ্যেই তারা কিচেন ও জেনারেটর রুম করেছে। আবার এ দুই রুমের মাঝখানে ছিল একমাত্র সিঁড়ি। তাই আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর পর্যটকরা নামতে পারেনি।’ প্রত্যক্ষদর্শী টুপটুপ রিসোর্টের পাশের মফিজ স্টোরের মালিক মুফিজুর রহমান বলেন, ‘এ রিসোর্টের জেনারেটর চলানোর জন্য প্রচুর ডিজেল মজুত থাকত। সম্প্রতি বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে আরও বেশি পরিমাণে ডিজেল মজুত করে রাখা হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আগুন পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করি। কিন্তু তারা এক ঘণ্টার পর ঘটনাস্থলে আসেন।’ আগুনের সূত্রপাতের প্রথমদিকের তিনটি ভিডিও এসেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে। ৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা- শুরুতে সাধারণ পর্যায়ে ছিল আগুনের তিব্রতা। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। আকাশে কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে থাকে। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে রিসোর্টের বাসিন্দাদের সরে আসতে বলেন। চিৎকার করে ভিতরে ‘আর কেউ আছে কি না’ তা জানতে চাইছেন। রাস্তায় আতঙ্কিত মানুষের ছোটাছুটি দেখা যাচ্ছে। অগ্নিকান্ডের শিকার বা আহত কয়েকজনকে অন্য মানুষজন ধরে উদ্ধার করতে দেখা গেছে। একজনকে রাস্তায় শুইয়ে রেখে শুশ্রƒষা দিচ্ছেন কয়েকজন। আরেকটা ভিডিওতে দেখা যায়- দাউ দাউ করে উজ্জ্বল কমলা রঙের আগুনের শিখা জ্বলছে এবং পুরো এলাকা ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ভবনটির মূল কাঠামোর ঠিক পাশেই বাঁশ ও কাঠের তৈরি একটি নির্মাণাধীন বা অস্থায়ী কাঠামো দেখা যাচ্ছে। আগুনের সামনের অংশে রাস্তার পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার দৃশ্যমান।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com