

ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে তুলনা কখনো পুরোপুরি যথার্থ হয় না। একটি সংঘাতের সঙ্গে অন্য সংঘাতের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু ভ্লাদিমির পুতিনকে তুষ্ট করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্লজ্জ প্রচেষ্টা ইতিহাসের একটি ব্যর্থ উদ্যোগের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেটি ১৯৩৮ সালে মিউনিখে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইনের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। নাৎসি জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে তিনি আপসের পথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। চেম্বারলেইনের প্রতি ন্যায়বিচার করতে গেলে একটি বিষয় স্বীকার করতেই হয়। ইতিহাস তার প্রতি খুব একটা সুবিচার করেনি। সে সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অধিকাংশ মানুষ তার শান্তি প্রচেষ্টাকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তখনো মানুষের মনে গভীর ক্ষত হয়ে ছিল। চেম্বারলেইনের মতো সাধারণ মানুষও আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ এড়াতে মরিয়া ছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের বিশ্বাসঘাতকতার পক্ষে জনমতের তেমন কোনো সমর্থন নেই। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তার সামনে নেই। ইউক্রেনের সঙ্গে তার বিশ্বাসঘাতকতার পেছনে রয়েছে নিজের স্বার্থসিদ্ধির নির্মম হিসাব। তার এই অবস্থান বিশ্বব্যাপী বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বিসর্জন দেওয়ার শর্ত নিয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কোর আলোচনা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। চলতি সপ্তাহে সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর সেই প্রক্রিয়া আরও অগ্রসর হয়েছে। এই সমঝোতা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এখন জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। এতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে। নিজের রাজনৈতিক সংকটের দায় ইউক্রেনের ওপর চাপাতে চাইছেন তিনি। একই সঙ্গে দেশটিকে কার্যত আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তিনি রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মাধ্যমে পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান দিচ্ছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ থেকেও সরে এসেছেন। ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় রহস্যজনকভাবে কয়েক দফা বন্ধ করেছেন। এসব পদক্ষেপের ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী পরিণতি দেখা গেছে। পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা আবার শুরু করেছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প কেন এমন আচরণ করছেন? এর একটি কারণ ব্যক্তিগত। তিনি জেলেনস্কিকে পছন্দ করেন না। এর কারণও সহজেই বোঝা যায়। ইউক্রেনের নেতা এমন সব গুণের অধিকারী, যেগুলোর কোনোটিই ট্রাম্পের মধ্যে নেই। জেলেনস্কি সাহসী, নীতিনিষ্ঠ ও নৈতিকভাবে প্রশ্নাতীত। তিনি পরিশ্রমী এবং রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ। আরেকটি কারণ অর্থ ও ক্ষমতার লোভ। ট্রাম্প তার সংকীর্ণ ও লোভী মন নিয়ে পুতিনের দমনমূলক এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অমান্যকারী শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে মরিয়া। এর মাধ্যমে তিনি জ্বালানি ও কাঁচামাল খাতে লাভজনক ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে চান। আর্কটিক অঞ্চল এবং মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আকর্ষণীয় চুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। ট্রাম্প এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার ধারণা পছন্দ করেন, যেখানে তিনটি সর্বশক্তিমান শক্তিকেন্দ্রের আধিপত্য থাকবে। এসব শক্তিকেন্দ্রের নেতৃত্বে থাকবেন কর্তৃত্ববাদী শাসকরা। তাদের একজন তিনি নিজে। অন্য দুজন রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের শি জিনপিং। তবে ট্রাম্পের আচরণের পেছনে আরও একটি রহস্যময় ও অশুভ কারণ থাকতে পারে। পুতিন তার ওপর একধরনের প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন বলে মনে হয়। সেই প্রভাবের প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। অথচ ট্রাম্প একসময় ছিলেন নিউইয়র্কের অভিজাত সমাজের বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত এক ব্যক্তি। তিনি আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একাধিকবার দেউলিয়া হয়েছে। এখন সেই ব্যক্তির ওপর পুতিনের রহস্যময় প্রভাবের বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ এরই মধ্যে সতর্ক করেছে। রাশিয়া প্রতিদিন ব্রিটেন ও ইউরোপের বিরুদ্ধে নানা ধরনের আক্রমণ চালাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে গুপ্তচর নেটওয়ার্ক, নাশকতাকারী, সাইবার যোদ্ধা এবং অর্থের বিনিময়ে নিয়োজিত এজেন্টদের। চলতি সপ্তাহের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। রাশিয়া এখন পশ্চিমা দেশগুলোর মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটগুলোকেও হুমকির মুখে ফেলছে বলে জানা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সাহায্যের জন্য বিশ্বাসঘাতক ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে থাকার কোনো অর্থ নেই। কারণ, তিনি এখন প্রতিপক্ষের শিবিরে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতায় পুতিন বিজয়ী হলে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম সীমান্তের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিভক্ত ও বিপর্যস্ত ইউক্রেনে অসংখ্য যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত হবে না। অপরাধীরাও শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। রাশিয়ার সফল আগ্রাসন একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। চীনসহ অন্য দেশগুলোও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।
এসব কারণে ব্রিটেন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের আর নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। জাতিসংঘে ক্ষুব্ধ বক্তৃতা দেওয়া যথেষ্ট নয়। পর্দার আড়ালে অসন্তোষ প্রকাশ করেও কোনো লাভ নেই। সতর্ক ভাষায় সামান্য তিরস্কারও পরিস্থিতি বদলাতে পারবে না। অতীতেও এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখন ট্রাম্পের সরাসরি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিতে হবে ব্রিটেনের অ্যান্ডি বার্নহাম, ফ্রান্সের ইমানুয়েল মাখোঁ, জার্মানির ফ্রিডরিখ মের্ৎস এবং কানাডার মার্ক কার্নিকে। প্রয়োজনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার ঝুঁকিও নিতে হবে তাদের।
ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে তার কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে বলতে হবে। পুতিনকে পুরস্কৃত করার জন্য তার বিরুদ্ধে বাস্তব ও কার্যকর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা ভয়ভীতি ও চাপের কাছে মাথানত করবে না। নিজেদের স্বার্থও বিকিয়ে দেবে না। ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে, তিনি কি সত্যিই এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হতে চান, যিনি পশ্চিমা জোটকে ধ্বংস করেছেন? তিনি কি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য পরিচিত হতে চান? সেটিই যদি তার ইচ্ছা হয়, তাহলে পুতিনের পা-চাটা চালিয়ে যেতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে তাকে একাই চলতে হবে।
ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটোর সদস্যদেশ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী অন্য দেশগুলো মোটেও শক্তিহীন নয়। অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তাদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। আরও নানা উপায়ে তারা নিজেদের শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্ব দেয় অন্য দেশগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে। এই নেতৃত্ব কোনো জন্মগত বা চিরস্থায়ী অধিকার নয়। মিত্রদেশগুলো চাইলে সেই সম্মতি প্রত্যাহার করতে পারে। অ্যান্ডি বার্নহাম প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটেনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধের নির্দেশ দিতে পারেন। এসব ঘাঁটি এখন বৈরী দখলদার শক্তির আপত্তিকর প্রতীক হয়ে উঠেছে। যে কোনো মূল্যে ট্রাম্পের এই বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিহত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই একে সফল হতে দেওয়া যায় না।
লেখক: গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাষ্যকার। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ