

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। রোববার দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ তার বিজয় ঘোষণা করে। জনমত জরিপ, অতীতের নির্বাচনী নজির এবং বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনমতের প্রবণতাকে উপেক্ষা করে লুলার এই জয়কে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থীদের ধারাবাহিক নির্বাচনী সাফল্যে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন লুলা। নির্বাচনের প্রথম দফায় এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত রান-অফে ৪০ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরে যান ফ্লাভিও।
পরাজয় মেনে না নিয়ে ফল বাতিলের আবেদন করার কথা জানিয়েছেন ফ্লাভিও। রোববার সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছিল এই যুক্তিতে তিনি ফল চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
ফ্লাভিওর এই অবস্থানের সঙ্গে ২০২২ সালের নির্বাচনে তার বাবা জইর বলসোনারোর প্রতিক্রিয়ার মিল রয়েছে। সেবার লুলার কাছে হারের পর জইর বলসোনারো পরাজয় মেনে নেননি। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার ফল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, ফ্লাভিওর পরাজয়ের ব্যবধান তার বাবার ২০২২ সালের পরাজয়ের ব্যবধানের দ্বিগুণেরও বেশি। তা ছাড়া, দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির কারণে ভোটের সময় বাড়ানোর দাবিও তার প্রচারশিবির থেকে তোলা হয়েছিল।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান রেনের লাতিন আমেরিকাবিষয়ক বিশ্লেষক মারিও ব্রাগা বলেন, আগামী কয়েক দিনে ডানপন্থীদের বিক্ষোভ হতে পারে। তবে তাতে নির্বাচনের ফল উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
লুলার এই জয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় প্রত্যাবর্তন। ৮০ বছর বয়সী এই নেতা ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে থাকার পর সংশ্লিষ্ট দণ্ডাদেশ বাতিল হয়। এর ফলে ২০২২ সালের নির্বাচনে জইর বলসোনারোকে পরাজিত করে তিনি আবার ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ পান।
লুলা বৈশ্বিক বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং চলতি শতাব্দীতে ব্রাজিলের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন। তার সমর্থকরা মনে করেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
লুলার সঙ্গে সাও পাওলোতে ভোট গণনার সময় উপস্থিত থাকা বামপন্থী ফেডারেল আইনপ্রণেতা এরিকা হিলটন রয়টার্সকে বলেন, ‘তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন মহীরুহ।’
তবে এবারের নির্বাচনে তার জয় সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে লুলা ও তার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতি ভোটারদের একাংশের সমর্থন কমেছিল। সাবেক ধাতুশ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা লুলাকে ক্রমবর্ধমান অ্যাপনির্ভর অর্থনীতি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে বলেও সমালোচনা ছিল।
তবু জনমত জরিপকারীদের মতে, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি লুলার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থিংক পলিসির সহপ্রতিষ্ঠাতা লিওনার্দো বারেতো বলেন, ভোটাররা বলসোনারোর নতুনত্বের চেয়ে লুলার পরিচিত রাজনৈতিক পথকেই বেছে নিয়েছেন।
তার ভাষায়, ‘মানুষ আজ কিছুটা শঙ্কা নিয়ে পরিবর্তনের পথ এবং নির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করে এমন পরিচিত পথের মধ্যে বেছে নিচ্ছে।’
নির্বাচনী প্রচারে লুলা তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন। তার তৃতীয় মেয়াদে বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও বন উজাড়ের হার রেকর্ড পর্যায়ে কমেছে বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতায় এলে সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় কমতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবের কাছে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেন লুলা।
লুলার জয় ট্রাম্পের জন্যও একটি রাজনৈতিক ধাক্কা। এর ফলে লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডানপন্থী সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান জোটে ব্রাজিলকে যুক্ত করার সম্ভাবনা কমল।
লুলার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিম রয়টার্সকে বলেন, লাতিন আমেরিকায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় লুলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। তার মতে, ‘লুলা নিজেই সেই ভারসাম্য।’
লুলার জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এশিয়ার লেনদেনে ব্রাজিলের বভেসপা সূচক অনুসরণকারী টোকিওতে তালিকাভুক্ত একটি এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) দর প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায়।
১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম দফার ভোটে দ্বিতীয় স্থানে থেকেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া প্রথম প্রার্থী হলেন লুলা।
এবারের প্রচারে বাস্তববাদী অর্থনৈতিক নীতি ও জনমুখী প্রতিশ্রুতির সমন্বয় ঘটান তিনি। শ্রমজীবী মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রচারের শেষ দিকে সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর প্রস্তাব দেন লুলা। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি, তার সরকারের জনপ্রিয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ১৫ শতাংশ অর্থ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, যার বাস্তবায়ন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া, কয়েক দশকের মধ্যে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শ্রম সংস্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত সাংবিধানিক সংশোধনীর পক্ষেও অবস্থান নেন লুলা। কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থনে এটি পাস হয়।
ঐতিহাসিক জয় সত্ত্বেও লুলার চতুর্থ মেয়াদ সহজ হবে না। কারণ, ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে ফেরার পর এবারই সবচেয়ে রক্ষণশীল কংগ্রেস নির্বাচিত হয়েছে ব্রাজিলে।
ফ্লাভিও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি এবং তাদের মিত্র দলগুলো নিম্নকক্ষে ২৮০টির বেশি আসন এবং সিনেটে সর্বোচ্চ ৫০টি আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এতে উভয় কক্ষেই বিরোধীদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে বাজেট, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের মতো বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরও সীমিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ক্ষেত্রে কংগ্রেসের প্রভাব বাড়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আরও জোরদার হতে পারে।
অর্থনীতিও লুলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তার সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। উচ্চ সুদের হার, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই পূর্বাভাস এসেছে।
মহামারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে সরকারি ঋণ এখন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। যদিও সরকারের সমালোচকেরা অতিরিক্ত ব্যয়কে এর জন্য দায়ী করছেন, ঋণের বৃদ্ধির বেশির ভাগই উচ্চ ঋণ গ্রহণ ব্যয়ের কারণে হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস, চতুর্থ মেয়াদে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে লুলা সীমিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেন। কারণ, তিনি রাষ্ট্রনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, পরিবারের ঋণ বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচনী প্রচারের সময় অনলাইন বাজির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন ঋণ-সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেন লুলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন রক্ষণশীল কংগ্রেস ব্যবসাবান্ধব কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে এসব সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় কমানো হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, লুলার ঐতিহাসিক বিজয় শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর রাজনৈতিক ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্বাচনী সাফল্যকে কার্যকর শাসনে রূপ দিতে তাকে এখন অর্থনৈতিক চাপ, শক্তিশালী বিরোধী কংগ্রেস এবং সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।