

খেলার মাঠে রাজনীতির প্রবেশ নতুন কিছু নয়, বিশেষ করে ভারতে। এবার দেশটির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকার হলেন বাংলাদেশের কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) নিলামে তাকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কেনার পরও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের চাপে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেএল)। গতকাল এক বিবৃতিতে ফ্র্যাঞ্চাইজটি নিশ্চিত করেছে মোস্তাফিজের বাদ দেওয়ার বিষয়টি।
কাটার মাস্টারকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এ সিদ্ধান্তে গোটা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জয় হয়েছে বলে মনে করেন দেশটির
ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতা সঙ্গীত সোম। ভারতের ধর্মীয় নেতা দেবকীনন্দন ঠাকুরও মোস্তাফিজকে আইপিএলে নেওয়ার কড়া সমালোচনা করেন। অন্যদিকে ‘ওপর মহলের’ চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন ভারতের হয়ে ১৯৮৩ সালের বিশ^কাপজয়ী সাবেক অলরাউন্ডার মদন পাল। এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ভারতের কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) শশী থারুরও। তারা বলেছেন, খেলাধুলায় রাজনীতি ঢোকানো উচিত নয়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এদিকে গুটিকয়েক উগ্রবাদীর হুমকিতে আইপিএল থেকে কাটার মাস্টারের নাম বাদ দেওয়ায় ভারতে বাংলাদেশ দলের টি২০ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল রাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এতে সিদ্ধান্ত হয় যেÑ ভারত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল কী ধরনের নিরাপত্তা পাবে, তা জানতে চেয়ে আজ রবিবার আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে বিসিবি। ব্যক্তি মোস্তাফিজকে যদি বিসিসিআই নিরাপত্তা দিতে না পারে, সে ক্ষেত্রে দল হিসেবে টাইগারদের জন্য দেশটি অনিরাপদ কিনা, সে ব্যাখ্যাও চাওয়া হবে। মোস্তাফিজের নাম সরিয়ে দেওয়ার কারণ জানতে চিঠি দেওয়া হবে আইপিএলের প্রধান নির্বাহীকেও।
বিসিবি ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেন, ‘আমরা অবশ্যই এটা নিয়ে কথা বলব। তবে আগে আমরা দেখে নিই পুরো বিষয়টা। তারা কী সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, সেটা এখনও আমি দেখিনি। তবে আমি দেখে (প্রতিবাদ) জানাব। আমরা নিশ্চয়ই এই বিষয়ে কথা বলব ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে।’
অন্যদিকে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জেগেছে, তিনি যেহেতু নিজে সরে যাননি, নিলামে ওঠা ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি কি তিনি পাবেন?
এর আগে বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেসবের কারণেই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে বিসিসিআই নির্দেশ দিয়েছে যেন বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। বিসিসিআই এটাও জানিয়েছে, কলকাতা চাইলে বদলি হিসেবে অন্য কোনো ক্রিকেটারকে নিতে পারবে। তাদের সে সুযোগ দেবে বিসিসিআই।’
গতকাল কেকেআরের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে- ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স নিশ্চিত করছে যে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আইপিএলের পরবর্তী পর্বের আগে মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ভারতীয় বোর্ডের নির্দেশে যথাযথ প্রক্রিয়া ও পরামর্শ মেনে এই কাজটি (মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়া) করা হয়েছে। আইপিএলের নিয়ম অনুযায়ী বিসিসিআই কলকাতাকে একজন বদলি খেলোয়াড় নেওয়ার অনুমতি দেবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ এনেছে বেশকিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। যেটা নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। এমন উত্তেজনার মধ্যে আইপিএলের নিলাম থেকে মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় খোদ কেকেআরের মালিক শাহরুখ খানের ওপর চটেছেন ক্রিকেটপ্রেমী থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা। পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ায় একরকম বাধ্য হয়ে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতাকে নির্দেশ দিয়েছে বিসিসিআই।
বাদ পড়ার খবরের পর অনেকটাই বিমর্ষ বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। রাজনৈতিক টানাপড়েনের বলি হয়ে আইপিএল থেকে বাদ পড়ার পর নিজের হতাশা চেপে রাখতে পারেননি তিনি। গতকাল গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় সংক্ষিপ্ত অথচ আক্ষেপমাখা কণ্ঠে মোস্তাফিজ বলেন, ‘ছেড়ে দিলে আর কী করার!’
নিলামের ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি কি পাবেন মোস্তাফিজ?
বিসিসিআই চাইলে আইপিএল বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে কোনো সময়। এমনকি নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড়কে খেলা থেকে বিরত রাখা বা নিষিদ্ধ করাও। তবে মোস্তাফিজের বিষয়টি নজিরবিহীন। এর আগে কোনো খেলোয়াড়কে নিলামের মাধ্যমে দলভুক্ত করে ফেলার পর শুধু রাজনৈতিক কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। মোস্তাফিজের নিলামে পাওয়া দামের ক্ষেত্রেও তাই বিসিসিআইকে নতুন নজিরই গড়তে হবে।
আইপিএলে ‘নো প্লে, নো পে’ নিয়ম রয়েছে। এটি তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন কোনো খেলোয়াড়কে নিলামে কেনার পর তিনি একটি ম্যাচও না খেলেই টুর্নামেন্ট থেকে সরে যান। এ সরে যাওয়া হতে পারে চোট বা অন্য যে কোনো কারণে। এ ধরনের ঘটনায় ওই খেলোয়াড়কে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। কিন্তু মোস্তাফিজের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের প্রতিবাদের মুখে ফ্র্যাঞ্চাইজিই তাকে বাদ দিয়েছে, তাও বোর্ডের নির্দেশে। নিয়ম অনুযায়ী, নিলামের পর খেলোয়াড় ও ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। যদি খেলোয়াড় আহত না হন এবং খেলার জন্য প্রস্তুত থাকেন, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজিকে পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে। এমনকি পুরো টুর্নামেন্ট বেঞ্চে বসিয়ে রেখে কোনো ম্যাচ না খেলালেও। তবে মোস্তাফিজের সঙ্গে কেকেআরের সেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সব আলোচনাই তাই ঘুরেফিরে যাচ্ছে বিসিসিআইয়ের কাছে, যারা মোস্তাফিজের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের তারকা পেসার নিলামে ওঠা দাম পাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তও একই জায়গা থেকেই আসার কথা। কারণ, পুরো বিষয়টাই আইপিএলের ১৯ বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
খেলাধুলায় রাজনীতির প্রবেশ দুঃখজনক
ওপর মহলের চাপে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন ভারতের হয়ে ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অলরাউন্ডার মদন লাল। আর ‘ওপর মহলের’ চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন ভারতের হয়ে ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অলরাউন্ডার মদন লাল। তিনি বলেন, বিসিসিআই এই সিদ্ধাস্ত নিয়েছে কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও না। কিন্তু খেলাধুলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে? আমি জানি না ক্রিকেট কোনো দিকে যাচ্ছে!
অন্যদিকে কংগ্রেস এমপি শশী থারুর স্টেটসম্যানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, খেলাধুলার মধ্যে রাজনীতি থাকা উচিত নয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
প্রসঙ্গত, মোস্তাফিজ আসন্ন আইপিএলে আদৌ খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গত কিছুদিন নানা বিতর্কসূচক খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা হচ্ছে দাবি করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অংশ, ধর্মীয় কিছু সংগঠন ও কিছু ধর্মীয় গুরু কড়া ভাষায় সমালোচনা করছিলেন মোস্তাফিজকে কেকেআরে নেওয়ার বিষয়ে। কিছু সংগঠন ও নেতাদের কেউ কেউ তাকে কলকাতা দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। এমনকি বাদ না দিলে তাকে খেলতে দেওয়া হবে না, পিচ নষ্ট করে দেওয়া হবেÑ এ রকম হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচি সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, ‘আইপিএলের কোনো দলে যদি কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটার রাখা হয় এবং কলকাতায় ম্যাচ খেলতে চায়, আমরা তা হতে দেব না। প্রয়োজনে আমরা শাহরুখ খানকেও কলকাতায় ঢুকতে দেব না। মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান শিব সেনা নেতা সাঞ্জায় নিরুপাম। কংগ্রেস নেতা সুপ্রিয়া শ্রিনাতে প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আইপিএলের নিলামে রাখা হলো কেন?