

বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসা করে মুনাফা করছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। কিন্তু সেই মুনাফার অর্থ ব্যবহারের চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বার্তা। একদিকে দেশে রেখে ব্যবসা সম্প্রসারণে পুনঃবিনিয়োগ কমছে, অন্যদিকে অর্জিত মুনাফার অর্থ ফিরে যাচ্ছে বিদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশি ব্যাংকগুলোর পুনঃবিনিয়োগ এক বছরের ব্যবধানে অর্ধেকেরও বেশি কমে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে মুনাফা ও আয়ের অর্থ প্রত্যাবাসন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এ সময় মুনাফা প্রত্যাবাসন ৫৭৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে ধীরগতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ রিটার্ন নিয়ে সংশয়ের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলো যেখানে নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে পিছিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আস্থার সংকট আরও বাড়ছে। ফলে দেশে অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ পুনঃবিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় আকারের ঋণ ও বিনিয়োগে অভ্যস্ত। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় ব্যাংকগুলোই বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে ট্রেজারি মার্কেটে বিনিয়োগ করে মুনাফা করছে। এতে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি কমছে। আর দেশীয় ব্যাংকের বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আস্থাও বাড়বে না। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে বিদেশি ব্যাংকগুলো সামগ্রিক চিত্র বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অস্থির ছিল।
মো. মাজেদুল হক বলেন, কয়েকটি বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোনো একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি হলে পুরো বিদেশি ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার প্রভাব পড়ে। এর ফলে নতুন ঋণ ও বিনিয়োগে বিদেশি ব্যাংকগুলো আরও সতর্ক হয়ে যায়। মুনাফা প্রত্যাবাসন বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের রিটার্ন নিয়ে সংশয় এবং দেশের ঋণমান নিয়ে নেতিবাচক বার্তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি হারে মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোর নেতিবাচক মূল্যায়ন বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকগুলোর আস্থায় প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতাও বিদেশি ব্যাংকের জন্য একটি বড় উদ্বেগ। তারা দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ও কার্যকর আইনি কাঠামো প্রত্যাশা করে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম : প্রবণতা ও পরিচালনাগত বিশ্লেষণ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে পরিচালিত ৯টি বিদেশি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা। আগের বছর ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। ঋণ বিতরণ কমার সঙ্গে পরিচালন মুনাফা কমেছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। তবে বেড়েছে নিট মুনাফা।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পূর্ব মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এ মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর-পূর্ব মুনাফা কমেছে প্রায় ৯২৮ কোটি টাকা। তবে কর ব্যয় কমে যাওয়ায় নিট মুনাফায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকায়।
দেশে পুনঃবিনিয়োগে বড় পতন : মুনাফা করলেও দেশে সেই অর্থের পুনঃবিনিয়োগে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো ৪ হাজার ৫৯৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা পুনঃবিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৬ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে পুনঃবিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। তারা মুনাফার একটি অংশ দেশে রেখে মূলধন শক্তিশালী করা, ঋণ সম্প্রসারণ ও ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ব্যবহার করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুনঃবিনিয়োগ কমে যাওয়া বাজার সম্পর্কে তাদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে মুনাফা প্রত্যাবাসন : পুনঃবিনিয়োগ কমলেও বাংলাদেশ থেকে অর্জিত মুনাফা ও আয়ের অর্থ বিদেশে পাঠানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও আয় প্রত্যাবাসনের পরিমাণ ছিল ৫৭৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এ সময়ে মুনাফা প্রত্যাবাসন বেড়েছে ৭৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এ ছাড়া ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে লভ্যাংশ প্রেরণও বেড়েছে। এ সময় বিদেশি ব্যাংকগুলো ৫৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকা লভ্যাংশ হিসেবে বিদেশে পাঠিয়েছে। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে লভ্যাংশ প্রেরণের পরিমাণ ছিল ৪৭৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। যদিও ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে কোনো লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন হয়নি।
দীর্ঘমেয়াদে উপস্থিতির ইঙ্গিতও রয়েছে : তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মুনাফা ও লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি চিত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর পুনঃবিনিয়োগকৃত আয়ের পরিমাণ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে লভ্যাংশ বিতরণ করে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের আয়ের একটি অংশ দেশে পুনঃবিনিয়োগ করে আসছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্যাবাসন বাড়লেও এটিকে পুরোপুরি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, দ্রুত ঋণসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশে অর্জিত মুনাফা ধরে রেখে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী করার চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে।