মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ন

আগুনঝরা জুলাই রক্তে লেখা এক বিপ্লবের দিনলিপি

ড. মোর্শেদ হাসান খান
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

একটি বিপ্লব কখনোই ধূমকেতুর মতো হঠাৎ আকাশে জ্বলে ওঠে না। তার জন্ম হয় মানুষের বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনা, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা থেকে।

অনেকটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো, যার অন্তরে বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকে উত্তপ্ত লাভা, আর একদিন বিস্ফোরিত হয়ে বদলে দেয় ইতিহাসের গতিপথ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও ছিল তেমনই এক বিস্ফোরণ; হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ ১৬ বছরের দমন-পীড়ন, বৈষম্য, দুর্নীতি এবং নিঃশব্দ আর্তনাদের অনিবার্য পরিণতি।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ভয়, নীরবতা ও নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছিল প্রধান যোগ্যতা।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমে সংকুচিত হয়েছে, বিরোধী মতকে দমন করা হয়েছে গ্রেপ্তার, গুম, মামলা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সূচকগুলোও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে দশম সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে স্থান পায়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৪ সালের বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬৫তম, আর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গণতন্ত্র সূচকে ১৬৭টি দেশের মধ্যে ৭৫তম।

পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যাই নয়; এগুলো একটি রাষ্ট্রের ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসা গণতান্ত্রিক পরিসরের দলিল।
ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা সাধারণ নাগরিক—কেউই সেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের দমন-পীড়ন থেকে রেহাই পাননি। আমিও ছিলাম সেই ভিন্নমত দমন প্রক্রিয়ার একজন প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। শুধু স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে এর আগে কোনো শিক্ষককে এমন পরিণতি ভোগ করতে হয়নি।

আমার মাথার ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় ২৭টিরও বেশি মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। সেই কাল্পনিক মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে মাত্র এক দিনের নোটিশে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। সেদিন আমি আমার ক্যান্সারাক্রান্ত স্ত্রীর অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকাতে পারিনি, আমার শিশুকন্যার কোনো প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারিনি। পাঠক, বলুন তো, ঠিক কোন অপরাধে আমি এই শাস্তি পেলাম? দীর্ঘ ছয়টি বছর আমি ক্লাসরুমে ফিরতে পারিনি, নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা রাখতে পারিনি। যে ছাত্রছাত্রীরা ছিলেন আমার প্রেরণার উৎস, তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়নি বহু বছর। গুম আর গ্রেপ্তারের আতঙ্কে বারবার নিজের অবস্থান বদলাতে হয়েছে। আর সেই দুর্দিনে আমার অসুস্থ স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে যে দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, তা এক ভয়ংকর উপাখ্যান।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যখনই সংকট এসেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বারবার হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের সূতিকাগার। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এই বিশ্ববিদ্যালয় পথ দেখিয়েছে জাতিকে। ২০২৪ সালের জুলাইও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন ধরে মোট ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটার জন্য নির্ধারিত। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান নয়; বরং মেধাভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। বিদ্যমান এই কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে আপিল বিভাগ পুনরায় কোটাব্যবস্থা বহাল রাখেন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রথমে ‘বাংলা ব্লকেড’-এর মতো স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ কর্মসূচির আয়োজন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৪ জুলাই ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে বসলেন, যারা কোটা নিয়ে আন্দোলন করছে, তারা রাজাকারের নাতিপুতি। রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক সময় একটি মাত্র বাক্যই জনমতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৪ জুলাইয়ের সেই মন্তব্যও তেমনই এক মুহূর্ত ছিল। যে আন্দোলন তখনো মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটি মুহূর্তের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও নাগরিক সম্মানের লড়াইয়ে রূপ নিতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঘৃণাভরে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। মশালে মশালে, স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠল মলচত্বর, হলপাড়া, টিএসসি। ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’ এই স্লোগান, আর ‘চাইলাম অধিকার, হলাম রাজাকার’—এই দেয়াল লিখন নতুন এক বারুদের ফুলকি জ্বালিয়ে দিল, যার প্রভাব হলো সুদূরপ্রসারী। স্বৈরাচার সরকার এই প্রতিরোধ সহ্য করতে পারল না। ১৫ জুলাই সরকারের পেটোয়া বাহিনী সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ঝাঁপিয়ে পড়ল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর।

১৫ জুলাইয়ের হামলার পর আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তার অভূতপূর্ব রূপ নেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বহু শিক্ষার্থী আহত হন, এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। তারপর আসে ১৬ জুলাই ২০২৪, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে যা এক অবিস্মরণীয় মোড়। সেদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিজের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তির সামনে। তাঁর হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, চোখে ছিল না প্রতিশোধের আগুন; ছিল কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস। মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশের গুলিতে তিনি লুটিয়ে পড়েন। সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ হয়, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেকের কাছে আবু সাঈদের মৃত্যু কেবল একজন শিক্ষার্থীর শাহাদাত নয়, সেটিই ছিল আন্দোলনের নৈতিক মোড়বদলের মুহূর্ত, যখন মানুষের ক্ষোভ দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একই দিন চট্টগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম। বীর চট্টলার প্রথম শহীদ ছাত্রদলের ওয়াসিম আকরাম মৃত্যুর অল্প কিছু আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এই নাম বুকে ধারণ করে আমি শহীদ হব। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষাই পূর্ণ করে দিলেন, আর তাঁর কাছে ঋণী করে দিলেন পুরো বাংলাদেশকে। এরপর মাঝরাত থেকেই ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো সাধারণ ছাত্ররা দখল করতে শুরু করল। ক্যাম্পাস থেকে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ বিতাড়িত হলো। আন্দোলন দমনের জন্য সরকার সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ ঘোষণা করল।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল খালি করার পর সরকার ভেবেছিল আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু নিয়তি ঠিক করে রেখেছিল অন্যকিছু। বাংলাদেশে যে নতুন বসন্তের আগমনী সুর বেজে উঠেছে, তাকে রুখবে সাধ্য কার? ১৮ জুলাই প্রতিরোধ গড়ে তুললেন বাংলাদেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, আইইউবি, এআইইউবি, নর্দান, মাইলস্টোন—আরো অনেক জানা-অজানা প্রতিষ্ঠান, এমনকি মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও সেদিন একযোগে রাস্তায় নেমে এসেছিল। তাদের প্রতিরোধ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালাল ফ্যাসিবাদী পুলিশ বাহিনী। ১৮ জুলাই দেশজুড়ে অন্তত ৩১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ঢাকাতেই প্রাণ হারান ২৪ জন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১১ জন ছিলেন শিক্ষার্থী। একই দিন দেশের ৫০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন সরকার মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং রাতের দিকে ব্রডব্যান্ড সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ কার্যত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মুখে পড়ে। ১৮ জুলাইয়ের শহীদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিইউপির শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান (মুগ্ধ)। মুগ্ধ শুধু একজন তরুণ ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। উত্তপ্ত রাজপথে যখন চারদিকে আতঙ্ক আর গুলির শব্দ, তখনো তিনি আন্দোলনরত মানুষের হাতে পৌঁছে দিচ্ছিলেন পানি। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে অন্যের তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে তিনি প্রাণ উৎসর্গ করেন। ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে নিজের প্রাণ দিয়ে মুগ্ধ প্রমাণ করে গেছেন মানবতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ। সেদিন ১৭ বছরের কিশোর ফারহান ফাইয়াজকেও রেহাই দেয়নি স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী। মুগ্ধ যেদিন শহীদ হলেন, সেই ১৮ জুলাইতে উত্তরায় রাজপথে গুলিবিদ্ধ হন আমার সহোদর ভাই সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মনিরুল হাসান খান। তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে। ১৮ জুলাইয়ের রক্তাক্ত ঘটনার পর সরকার ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে। রাজধানীসহ সারা দেশে নেমে আসে এক অস্বাভাবিক নীরবতা, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় জনজীবন।

কারফিউ ভেঙে মুক্তিকামী মানুষ যখন রাজপথে নেমেছিল, প্রতিবাদের জবাব এসেছিল নির্মম দমন-পীড়নে। জুলাইয়ের শেষ দিকের কারফিউবন্দি ঢাকায় একের পর এক পরিচয়হীন লাশ পৌঁছায় রায়েরবাজার কবরস্থানে। ছিল না শোকযাত্রা, ছিল না মৃত্যুসনদ বা ময়নাতদন্ত। সাদা কাপড়ে মোড়ানো দেহগুলো তড়িঘড়ি মাটিচাপা দেওয়া হয়, চার নম্বর ব্লকের প্রতিটি কবর চিহ্নিত ছিল কেবল একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে। আন্দোলনে নিহত অন্তত ১১৪ জনকে সেখানে দাফন করা হয়, যাঁদের বেশির ভাগই ১৯ থেকে ২২ জুলাইয়ের কারফিউ চলাকালে প্রাণ হারান। একই সময় আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি, গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চলতে থাকে, শীর্ষ নেতাদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের পর প্রচার করা হয় যে তাঁরা নাকি স্বেচ্ছায় আন্দোলন স্থগিত করেছেন। ১৬ বছরের শাসনে এভাবেই সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা এই আন্দোলনকে কখনো বিদেশি ষড়যন্ত্র, কখনো রাজাকার বা জামায়াতের তকমা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে। এমনকি নিহত শিশু রিয়া গোপকেও ষড়যন্ত্রের অংশ বলে অপপ্রচার করা হয়। আর ক্ষমতার শীর্ষে তখন মানবিকতার বদলে প্রাধান্য পেয়েছিল প্রতীকী অভিনয় ও প্রচারণার রাজনীতি। হাসিনা সেদিন মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করলেন মেকি বেদনার, তিনি গিয়েছিলেন কেবল ভাঙা কাচের ছবি তুলতে।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সম্পৃক্ত হন। একটি কোটা সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। লাশের মিছিল প্রতিদিন বাড়তেই থাকল। এই পর্যায়ে দমনের খড়্গ নেমে এলো বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ওপরও। নতুন করে শুরু হলো গুম, খুন, নির্যাতন। তখন সরাসরি হুমকির মুখে পড়লাম আমিও। গোয়েন্দা সূত্রে জানতে পারি, University Teachers Association of Bangladesh (UTAB)-এর মহাসচিব হিসেবে আমি ছিলাম তাদের কেন্দ্রীয় টার্গেট। আমাকে ধরতে পারলেই অন্য শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দমিয়ে রাখবে। আমার ছোট্ট মেয়ে, যাকে আমি একটি রঙিন শৈশব উপহার দিতে পারিনি, আমার অসুস্থ স্ত্রী, যার পাশে আমি থাকতে পারিনি, তাঁদের নতুন কোনো উৎকণ্ঠায় ফেলার ইচ্ছা আমার ছিল না। তাই গ্রেপ্তার আর গুম এড়াতে সেদিনের পর আর বাসায় থাকা হয়ে উঠল না আমার। পথে পথে ঘুরলাম, পরিবার ছেড়ে, এক বন্ধুর বাসা থেকে আরেক বন্ধুর বাসায় গেলাম, মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে। ডিবি সদস্যরা সকাল-বিকেল আমার বাসায় এসে তল্লাশি চালাতে লাগল। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে পরিবারের কোনো সদস্যই নিরাপদে বাসায় থাকতে পারতেন না। নিরাপত্তার স্বার্থে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বা ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে হতো। শুধু তাই নয়, আমাকে খুঁজে বের করার জন্য আমার ঘনিষ্ঠ ও পরিচিত মানুষদেরও ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো এবং আমার অবস্থান জানার জন্য তাঁদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হতো। প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার, গুম বা নির্যাতনের আশঙ্কায় দিন কাটাতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক শুধু আমার নয়, আমার পুরো পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। আমার নিজের ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, আমার বয়স্কা মা, অসুস্থ স্ত্রী আমার উৎকণ্ঠায় রাতের পর রাত পার করেছেন। ঠিক কোন অপরাধে আমি এই দুঃসহ শাস্তি পাচ্ছিলাম, শুধু প্রশ্ন করার জন্য, নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করার জন্য, একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার জন্য?

সেই কঠিন দিনগুলোতে আন্দোলনের প্রতিটি মোড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। প্রবাসে অবস্থান করেও তিনি ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানান এবং বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ গণতন্ত্রকামী মানুষকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান। ১৬ জুলাই যুগপৎ বিরোধী দলগুলোর যৌথ বিবৃতি, ১৭ ও ১৯ জুলাইয়ের বার্তা এবং ২১ জুলাই জাতীয় ঐক্যের আহবান—সব মিলিয়ে তিনি আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখেন। আমাদের দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজপথের সংগ্রাম, দমন-পীড়নের মধ্যেও সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিরোধের মানসিকতা সেই সময় নতুন প্রজন্মের আন্দোলনের সঙ্গে এক ধরনের সেতুবন্ধ তৈরি করে। তাঁর নির্দেশনা ও উৎসাহে আমরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠন, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের কাজে আরো সক্রিয় হয়ে উঠি। প্রতিদিনই লন্ডন থেকে জনাব তারেক রহমান আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি কেবল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতেন না, আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং করণীয় নিয়েও নিয়মিত নির্দেশনা দিতেন। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল : এই আন্দোলনের নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের; রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হবে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের আন্দোলনকে শক্তি জোগানো, কিন্তু কোনোভাবেই তাকে দলীয় রূপ না দেওয়া। সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করেছি।

এরপর আন্দোলন এগিয়ে গেল তার চূড়ান্ত পরিণতির দিকে। আগস্টের শুরু থেকেই ঢাকার রাজপথে একটাই আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, ‘এক দফা, এক দাবি, শেখ হাসিনার পদত্যাগ।’ তারপর এলো ৫ আগস্টের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জাতি তখন এক নতুন বিস্ফোরণের জন্য, এক নতুন রক্তস্রোতে অবগাহনের জন্য প্রস্তুত। সকাল থেকেই থমথমে রাজধানী। নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তাভ চোখ, আগ্রাসী পুলিশ, বিজিবিসহ নানা বাহিনীর সাঁজোয়া যান, তাক করা রাইফেল, কালো পোশাকের র‌্যাবের ভয়ংকর মহড়া—সব মিলিয়ে এক আতঙ্কের পরিবেশ। কিন্তু একবার মানুষ মরতে শিখে গেলে তার আর ভয়ডর থাকে না।

সেদিন জনাব তারেক রহমান আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিলেন, ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগের জন্য। তাঁর নির্দেশনায় এই গণ-আন্দোলনে শামিল হতে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জড়ো হন ইউট্যাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষকরা। ইউট্যাবের মহাসচিব হিসেবে দ্রুত শিক্ষকদের কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছে দিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের সমন্বয় করি৷ শিক্ষকরা যখন কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন, তখন আমি দৃঢ়ভাবে তাঁদের কারফিউ ভাঙতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে উদ্বুদ্ধ করি। অতঃপর কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শিক্ষকরা এগিয়ে যান শাহবাগ পর্যন্ত। পুলিশ বাধা দিলেও শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রতিরোধের সামনে সেদিন দাঁড়াতে পারেনি হাসিনার পুলিশ। শিক্ষকদের সেই কারফিউ ভাঙার দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজধানীজুড়ে শুরু হলো কারফিউ ভাঙার হিড়িক। গুটিয়ে গেল হাসিনার নিরাপত্তাবেষ্টনী। অলিগলিতে থাকা লাখ লাখ মানুষের লক্ষ্য তখন একটাই—ফ্যাসিবাদের শেষ দুর্গ গণভবন। জনস্রোত ছুটতে থাকল সেদিকেই। এরপর এলো সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয়। দুপুরের পরপরই হেলিকপ্টারে করে দিল্লি পালিয়ে গেলেন চব্বিশের গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা।

সেদিন আমার ভেতরে একসঙ্গে কাজ করছিল অসংখ্য অনুভূতি। আমি সেই বাবা, যে রাষ্ট্রের নিপীড়নের কারণে নিজের সন্তানের শৈশবকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমি সেই স্বামী, যে সবচেয়ে কঠিন সময়েও ক্যান্সারে আক্রান্ত স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেনি। আমি সেই শিক্ষক, যাঁকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অপরাধে নিজের প্রিয় ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। যার বিরুদ্ধে একের পর এক ২৭টিরও বেশি মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তাই ৩৬শে জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমি বুক উঁচু করে বলেছিলাম,  আমি কখনো রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলাম না, আমি আমার দেশ, আমার মানুষ এবং সত্যের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলাম। ফ্যাসিবাদের অন্ধকারতম দিনগুলোতেও আমার প্রতিবাদ থেমে থাকেনি; কখনো কলমে, কখনো কণ্ঠে, কখনো নীরব প্রতিরোধে আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। তবে আমার সেই আত্মত্যাগও ম্লান হয়ে যায় জুলাইয়ের সেই অগণিত তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগের কাছে। তাঁরাই খালি বুকে রাইফেলের নলকে উপেক্ষা করে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের রক্ত, তাঁদের সাহস এবং তাঁদের আত্মত্যাগই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছে। যদি আমাকে দেশপ্রেমিক বলা হয়, তবে তাঁদের বলতে হবে এই জাতির শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ও গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ
জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com