সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৭ অপরাহ্ন

বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কোনো সদস্য বিদ্রোহ করলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। শুধু বিদ্রোহে সরাসরি অংশ নেওয়াই নয়, বিদ্রোহে প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহের কারণ সৃষ্টি, তাতে যোগদান, বিদ্রোহ দমনে যথাসাধ্য চেষ্টা না করা কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খবর না দেওয়াকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি বিদ্রোহীদের অস্ত্র-গোলাবারুদ বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা এবং বিদ্রোহসংক্রান্ত তথ্য গোপন করলেও একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এ। তবে এই যাবজ্জীবন দণ্ড কার্যকর করতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি কোনো সদস্য ৯০ দিনের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি হারাবেন।

১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ যুগোপযোগী করে বাংলায় ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ২৪ আগস্ট মন্ত্রিসভা আইনটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হয়। বর্তমানে বিলটি পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।

নতুন আইনের অন্যতম বড় পরিবর্তন হচ্ছে, এপিবিএনের সদস্যদের ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব। ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন মেনে ইউনিটের সদস্যরা অপরাধ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতার বিষয়টিও নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইনের ২৩ ধারায় ‘বিশেষ আদালত কর্তৃক বিচার্য অপরাধ ও দণ্ড’ শিরোনামে এসব বিধান রাখা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, এ ধরনের অপরাধের বিচার হবে বিশেষ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদালতে।

আইনের ২৩(২)(ক) ধারায় বলা হয়েছে, উপধারা (১)-এর (ক) থেকে (ঙ) দফায় বর্ণিত অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থদণ্ডও আরোপ করা যাবে।

অর্থাৎ বিদ্রোহ সংঘটন থেকে শুরু করে এতে প্ররোচনা, কারণ সৃষ্টি, ষড়যন্ত্র, যোগদান, বিদ্রোহ দমনে যথাসাধ্য চেষ্টা না করা, বিদ্রোহের খবর গোপন করা কিংবা বিদ্রোহীদের অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে সহায়তার মতো অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন।

আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্যমান আইনেও এপিবিএনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবনের বিধান রয়েছে।

এদিকে আনসার ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৩ অনুযায়ী আনসার সদস্যদের বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন, ২০১০-এ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

প্রস্তাবিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬ এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্য বিদ্রোহের স্থানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা দমনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা না করলে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এ ছাড়া কোনো সদস্য বিদ্রোহ সম্পর্কে জানার পর কিংবা কোনো বিদ্রোহের অস্তিত্ব রয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি তার অধিনায়ক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানালে সেটিও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিদ্রোহের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কোনো সদস্য কিংবা এপিবিএনের বাইরের কোনো ব্যক্তিকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, দ্রব্যসামগ্রী বা অন্য কোনো উপায়ে সহায়তা করাকেও একই ধারায় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য ফাঁস, সহায়তা করা, এ সংক্রান্ত অন্য কোনো অপরাধ করা কিংবা বিদ্রোহসংক্রান্ত তথ্য গোপন করলেও বিশেষ আদালতে বিচার হবে। এ ছাড়া জ্ঞাতসারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর অপরাধজনক বল প্রয়োগ বা বল প্রয়োগের চেষ্টা এবং কোনো সদস্যকে সরকারের প্রতি তার কর্তব্য বা আনুগত্য থেকে বিরত রাখার চেষ্টাকেও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্যাম্প, ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর বা ব্যারাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা বিপদ সংকেতের কারণ ঘটানো বা তা প্রচার করাও অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ধারা ২৩-এ বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে।

২৩(২)(খ) ধারায় বলা হয়েছে, (চ) থেকে (ঝ) দফায় বর্ণিত অপরাধের ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।

বিশেষ আদালত এই ধারার অধীন শাস্তিযোগ্য যে কোনো অপরাধ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অথবা কোনো ব্যক্তির দাখিল করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমলে নিতে পারবে। এক্ষেত্রে আইনে নির্দেশিত কার্যবিধি অনুসরণ করতে হবে।

প্রস্তাবিত আইনের ২৪ ধারায় সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচারযোগ্য বিভিন্ন অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিটের অস্ত্র, গোলাবারুদ, পোশাক, যন্ত্রাংশ বা যানবাহনের অংশ পরিকল্পিতভাবে নষ্ট বা অবহেলায় হারিয়ে ফেলা, কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল হওয়া, প্রহরীর ওপর আঘাত বা অপরাধজনক বল প্রয়োগ, কয়েদি পালিয়ে যেতে দেওয়া, অনুমতি ছাড়া ডিউটি পোস্ট বা টহল পরিত্যাগ, দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং ঊর্ধ্বতন সদস্যের আইনানুগ আদেশ অমান্য করার মতো অপরাধ রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে ফেলা, অসুস্থতার ভান করা, স্বেচ্ছায় নিজেকে আঘাত করা, অবৈধভাবে চাঁদা আদায়, অপরাধী আটক করতে ব্যর্থ হওয়া, সম্পত্তি লুট বা ধ্বংস এবং কোনো সদস্যকে আঘাত বা অপরাধজনক বল প্রয়োগের মতো অপরাধও এই তালিকায় রয়েছে। এসব অপরাধে সংক্ষিপ্ত আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।

আইনের ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, সংক্ষিপ্ত ও বিশেষ আদালতের কার্যধারা, রায়, আদেশ, আরোপিত দণ্ড বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্য কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি ওই দণ্ডের ক্ষমা প্রার্থনা করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আপিল আদালতের রায় বা আদেশ বা সিদ্ধান্ত ঘোষণার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করতে পারবেন।

দণ্ড কার্যকরসংক্রান্ত ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যাটালিয়ন সদস্যকে কারাগারে পাঠানোর জন্য দণ্ড প্রদানকারী আদালতের সভাপতি তফসিল অনুযায়ী পরোয়ানা স্বাক্ষর করবেন। আর কোনো সদস্য ৯০ দিনের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন।

প্রস্তাবিত আইনটিতে এপিবিএনের সদস্যদের জন্য বিশেষ ও সংক্ষিপ্ত— দুই ধরনের আদালতের মাধ্যমে অপরাধের বিচারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্রোহকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com