শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৪ অপরাহ্ন

আমেরিকানরা এখনো যে কারণে রাস্তায় রাত কাটায়, বাংলাদেশের যা শেখা দরকার

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
সিলিকন ভ্যালি সৃষ্টি করেছে বিপুল সম্পদ, হলিউড তৈরি করেছে বিশ্বজোড়া জৌলুশ, আর ক্যালিফোর্নিয়া গড়ে তুলেছে এমন এক অর্থনৈতিক শক্তি, যার আকার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়েও বড়। অথচ লস অ্যাঞ্জেলেসের যেসব রাস্তায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই হাজারো মানুষ তাঁবু, গাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে রাত কাটান।

আলোচ্য শিরোনামের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী অঙ্গরাজ্য, যার অর্থনীতির আকার ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি, সেখানে এমন শ্রমজীবী মানুষ কেন রয়েছেন, যাঁরা আয় করা সত্ত্বেও একটি বাড়ির খরচ বহন করতে পারেন না?
এর উত্তর বেকারত্ব, অলসতা কিংবা অপরাধপ্রবণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার এই সংকটের পেছনে রয়েছে আবাসনের স্বল্পতা, আকাশছোঁয়া ভাড়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা, মাদকাসক্তি, ভূমি ব্যবহারের বিধিনিষেধ এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা—যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, পুঁজিবাদ বা প্রবৃদ্ধিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং উপলব্ধি করা যে আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও জবাবদিহিমূলক ব্যয় ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে সমৃদ্ধির পাশেই অনিরাপত্তা থেকে যেতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া সম্প্রতি ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন অতিক্রম করা প্রথম মার্কিন অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বলে রাজ্য সরকার প্রকাশিত নতুন ফেডারেল তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে।

প্রযুক্তি, বিনোদন, কৃষি, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থায়ন ও পেশাগত সেবাসহ বিভিন্ন খাত নিয়ে গঠিত এ অর্থনীতি। রাজ্যটির দাবি, দেশ হিসেবে তুলনা করলে এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি।কিন্তু জিডিপি দিয়ে বোঝা যায় না, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী তাঁর বাসাভাড়া দিতে পারছেন কি না, একজন ডেলিভারিকর্মী চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন কি না, কিংবা সাময়িক আয়হানির ধাক্কা মোকাবিলায় একটি পরিবারের পর্যাপ্ত সঞ্চয় রয়েছে কি না।

আবাসনের সংকট ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্য

ক্যালিফোর্নিয়ার এই বৈপরীত্যের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন।

সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদেরা রেস্তোরাঁ, খুচরা ব্যবসা, পণ্য সরবরাহ এবং হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমন শ্রমিকদের কথা তুলে ধরেন, যাঁরা পূর্ণকালীন কাজ করেও স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করতে পারেন না। মাসিক আয়ের অধিকাংশ যদি বাড়িভাড়ায় চলে যায়, তাহলে গাড়ি নষ্ট হওয়া, অসুস্থতা কিংবা কয়েক দিনের কাজ হারানোর মতো ঘটনাও একজন মানুষকে আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে উচ্ছেদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।কঠোর জোনিং বিধিমালা, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং অধিক ঘনত্বের আবাসন নির্মাণে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতার কারণে কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত বাড়ি নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ের এই বিরোধিতা প্রায়ই ‘নিমবি’ (NIMBY—Not In My Backyard) নামে পরিচিত; অর্থাৎ, নিজের এলাকায় নতুন আবাসন বা উন্নয়ন প্রকল্প না চাওয়ার প্রবণতা।

এর ফলে আবাসনসংকট ক্রমেই নিজেকে আরও শক্তিশালী করে।

প্রযুক্তি খাতের উচ্চ আয়ের কর্মীরা সীমিতসংখ্যক বাড়ির জন্য বেশি ভাড়া বা দাম দিতে পারেন। অন্যদিকে, স্বল্প আয়ের কর্মীদের ঠাঁই হয় অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাসস্থানে, দীর্ঘ যাতায়াতের পথে, গাড়িতে কিংবা শেষ পর্যন্ত রাস্তায়। ফলে এমন একটি অর্থনীতি তৈরি হয়, যেখানে চাকরি থাকলেই আবাসনের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ঢাকা ও অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল শহরে আবাসনকে শুধু ব্যক্তিখাতের সমস্যা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর আবাসনের সমাধান খোঁজার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি সাশ্রয়ী ও অধিক ঘনত্বের আবাসন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনায় থাকতে হবে গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা।

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ছাড়া প্রবৃদ্ধি

ক্যালিফোর্নিয়া আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনেছে: সামগ্রিক সম্পদ বাড়লেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে। সিলিকন ভ্যালি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করেছে। হলিউড বিনোদন ও মেধাস্বত্বকে আন্তর্জাতিক রপ্তানিপণ্যে পরিণত করেছে। কৃষি, মহাকাশ ও উড়োজাহাজশিল্প, জীবপ্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পও ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি বাড়িয়েছে।

কিন্তু এই সমৃদ্ধি সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। যখন শ্রমশক্তির একটি অংশ বছরে কয়েক লাখ ডলার আয় করে, তখন বাড়ির মালিকদের জন্য সর্বোচ্চ ভাড়া দিতে সক্ষম ভাড়াটিয়াদের কাছে আবাসন ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে সম্পদের মূল্য সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। ঢাকায় জমি ও আবাসনের দাম যদি মজুরির তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। কাগজে-কলমে একটি শহর আরও ধনী হয়ে উঠলেও আবাসনের নিরাপত্তা, যাতায়াতে ব্যয় করা সময় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর হাতে থাকা অর্থের বিচারে সাধারণ পরিবারগুলো আরও অসচ্ছল হয়ে পড়তে পারে।

সরকারি বাজেট ও ব্যয়ের জবাবদিহির শিক্ষা

ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা।
ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট অডিটরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে গৃহহীনতা ও আবাসনসংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরীক্ষায় বলা হয়, গৃহহীনতা মোকাবিলার কর্মসূচিগুলোর ব্যয় ও ফলাফল ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করার ব্যবস্থা রাজ্যটির ছিল না। পর্যালোচনা করা পাঁচটি কর্মসূচির মধ্যে দুটি ব্যয়-সাশ্রয়ী বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। অন্য তিনটির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত ফলাফলসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এখানে মূল সমস্যা সুশাসনের। কোনো সরকার সামাজিক সংকট মোকাবিলায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করলে তাকে দেখাতে হবে—অর্থ কোথায় গেছে, কী কাজে ব্যয় হয়েছে, কতজন মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং তাঁরা পরবর্তী সময়েও আবাসন ধরে রাখতে পেরেছেন কি না।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা রয়েছে। একে বলা যেতে পারে ‘রাজস্বভিত্তিক পুঁজির ক্ষয়’। অর্থাৎ, প্রশাসনিক স্তর বৃদ্ধি, একই ধরনের কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি, দীর্ঘসূত্রতা ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে সরকারি সম্পদের এমন অপচয়, যার ফলে সেই ব্যয় থেকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ বা পরিমাপযোগ্য সামাজিক সুফল তৈরি হয় না।

এ কারণে প্রতিটি বড় সামাজিক কর্মসূচির জন্য থাকতে হবে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, স্বচ্ছ বাজেট, একক জবাবদিহিমূলক কর্তৃপক্ষ, ডিজিটাল ব্যয় অনুসরণব্যবস্থা এবং স্বাধীনভাবে ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা।

কিছু মার্কিন অর্থনীতিবিদ বেসরকারি বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের তীব্র সমালোচনা করেন। তবে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মানুষের কাছে পৌঁছানো, পুনর্বাসন, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা এবং বিশেষায়িত সামাজিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এনজিওগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করার অর্থ জবাবদিহির দায়ও তাদের কাছে দিয়ে দেওয়া নয়।

নীতি, মানদণ্ড, তথ্য, ক্রয়প্রক্রিয়া ও নিরীক্ষার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে। সরকারি অর্থ একাধিক সংস্থা, এনজিও ও ঠিকাদারের হাত ঘুরে ব্যয় হলেও সরকারকে জানতে হবে—ঠিক কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, কোথায় হয়েছে, কী কাজে হয়েছে, কারা উপকৃত হয়েছেন এবং কী ফলাফল অর্জিত হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার নিরীক্ষায় এই জবাবদিহির ধারাবাহিকতা হারানোর ঝুঁকি উঠে এসেছে। স্টেট অডিটর উল্লেখ করেছেন, গৃহহীনতা মোকাবিলায় অর্থায়নের সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলেও কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ধারাবাহিক তথ্য রাজ্যটির কাছে ছিল না।

বাংলাদেশের জন্য নীতিটি হওয়া উচিত সরল: এনজিও বাস্তবায়ন করতে পারে, কিন্তু ফলাফলের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য ও গৃহহীনতার পারস্পরিক সম্পর্ক

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় ফেন্টানিলের মতো শক্তিশালী মাদক এবং মাদকাসক্তির সঙ্গে গৃহহীনতা, মানসিক অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও অপরাধের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

মাদকাসক্তি একজন মানুষের আয়, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সম্পর্ক ধ্বংস করতে পারে। অন্যদিকে, রাস্তায় বসবাসের অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়ায় এবং চিকিৎসা গ্রহণের পথ কঠিন করে তোলে। ফলে সমস্যাগুলো একে অপরকে আরও গভীর করে।

বাংলাদেশের জন্য এ শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাদকাসক্তিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন মাদক প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক সহায়তা, নিরাপদ আবাসন এবং কর্মসংস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। প্রকৃত নীতিগত চ্যালেঞ্জ হলো, এই সমস্যাগুলো যেন একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।

অপরাধ দমনে ভারসাম্যের প্রশ্ন

ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতা অপরাধবিচার, মাদকাসক্তির চিকিৎসা এবং জননিরাপত্তার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জটিলতাও তুলে ধরে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটারদের অনুমোদন পাওয়া ‘প্রপোজিশন ৪৭’ কিছু স্বল্পমাত্রার চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কমিয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে খুচরা দোকানে চুরি, বারবার অপরাধ সংঘটন এবং জননিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

২০২৪ সালে এসব উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা ‘প্রপোজিশন ৩৬’ অনুমোদন করেন। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘হোমলেসনেস, ড্রাগ অ্যাডিকশন অ্যান্ড থেফট রিডাকশন অ্যাক্ট’—অর্থাৎ গৃহহীনতা, মাদকাসক্তি ও চুরি হ্রাস আইন।

এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু পুনরাবৃত্ত চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু মাদক রাখার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়।

প্রপোজিশন ৩৬ অনুযায়ী, ৯৫০ ডলার বা তার কম মূল্যের সম্পদ চুরির কিছু ঘটনা অপরাধীর পূর্ববর্তী নির্দিষ্ট অপরাধের রেকর্ড থাকলে গুরুতর অপরাধ বা ‘ফেলনি’ হিসেবে বিচারের আওতায় আনা যেতে পারে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট মাদকসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আদালতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিতর্ক একটি বৃহত্তর নীতিগত দ্বিধা তুলে ধরে। মাদকাসক্তি ও পুনরাবৃত্ত অপরাধের সমস্যার সমাধান না করে শাস্তি কমালে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। আবার শুধু কঠোর শাস্তির ওপর নির্ভর করলেও মাদকনির্ভরতা ও গৃহহীনতার অন্তর্নিহিত কারণগুলো দূর করা কঠিন।

অপরাধবিচারব্যবস্থাকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। সংগঠিত মাদক পাচার, বারবার সংঘটিত গুরুতর চুরি এবং সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু শাস্তি দিয়ে মাদকাসক্তির অবসান ঘটানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জন্য ছয়টি শিক্ষা

প্রথমত, নগরায়ণের সংকট তীব্র হওয়ার আগেই আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সাশ্রয়ী ও অধিক ঘনত্বের আবাসনকে সমন্বিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমার্থক ভাবা যাবে না। প্রকৃত অর্থনৈতিক সাফল্য পরিমাপ করতে হবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, আবাসনের নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের ভিত্তিতে।

তৃতীয়ত, সরকারি অর্থের অপচয় ও উৎপাদনশীল সক্ষমতার ক্ষয় রোধ করতে হবে। সরকারি বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিমাপযোগ্য সামাজিক সম্পদ ও ফলাফল তৈরি করা, শুধু প্রশাসনিক কাঠামো বড় করা নয়।

চতুর্থত, এনজিও যুক্ত থাকলেও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার সেবা প্রদানের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে দিতে পারে, কিন্তু সরকারি অর্থের দায়িত্ব এড়াতে পারে না।

পঞ্চমত, মাদকাসক্তিকে নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করতে হবে। ফেন্টানিলের অভিজ্ঞতা দেখায়, মাদকনির্ভরতা কত দ্রুত গৃহহীনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসংকট ও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

ষষ্ঠত, অপরাধবিচার ও পুনর্বাসনের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রপোজিশন ৪৭ ও প্রপোজিশন ৩৬ নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সামাজিক অবকাঠামো ছাড়া শুধু শাস্তির নীতিতে পরিবর্তন আনলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয় না।

চূড়ান্ত সতর্কবার্তা

ক্যালিফোর্নিয়া কোনো ব্যর্থ অর্থনীতি নয়। আর এ কারণেই তার গৃহহীনতার সংকট এত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যটির প্রযুক্তি কম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি, বিনোদনশিল্প ও উদ্যোক্তারা অসাধারণ উৎপাদনক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক শক্তি একাই সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই ক্যালিফোর্নিয়ার ফুটপাতে সারি সারি তাঁবু কেবল একটি মানবিক সংকটের দৃশ্য নয়; এগুলো অর্থনীতির জন্যও সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের জন্য বিপদটি ক্যালিফোর্নিয়ার মতো হয়ে ওঠা নয়। বরং বিপদ হলো, ভুল উন্নয়নধারা অনুসরণ করা—দ্রুত নগরায়ণ, জমির মূল্যবৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসনের ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, মাদকের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের ফলাফল কঠোরভাবে পরিমাপ না করেই সামাজিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়। বাংলাদেশের সামনে এখনো ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন সম্পদ সৃষ্টি করবে, তেমনি মানুষের জন্য বাসস্থানও নিশ্চিত করবে। বাজেট শুধু ব্যয়ের হিসাব দেবে না, বাস্তব ফলাফলও দেখাবে। মাদকসংক্রান্ত আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। এনজিও রাষ্ট্রকে সহায়তা করবে, কিন্তু রাষ্ট্রের বিকল্প হয়ে উঠবে না।

সর্বোপরি, অর্থনৈতিক সাফল্যকে শুধু জিডিপির আকার, রপ্তানি কিংবা শতকোটি ডলারের ব্যবসা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে এই প্রশ্নে—একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ তাঁর আয় দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, একটি নিরাপদ বাড়িতে থাকতে পারছেন কি না এবং বিপদের সময় সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন কি না।

আমেরিকার সবচেয়ে ধনী অঙ্গরাজ্যের জৌলুশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠিন শিক্ষাটি এটাই—বাংলাদেশের উচিত, নিজস্ব নগর সমৃদ্ধি অনিরাপত্তার উৎসে পরিণত হওয়ার আগেই এই শিক্ষা গ্রহণ করা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com