মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১
  • ১৯৪ বার

শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে খান খান করে দিয়েছে করোনা। এ অবস্থায় সংক্রমণ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ক্ষতির পরিমাণও তত বাড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কোনো চিন্তায় ফল আনছে না। গতানুগতিক ক্লাস-পাঠের বিকল্প কোনো পদ্ধতিই শিখন-পঠন, দক্ষতা-জ্ঞানে পূর্ণতা পাচ্ছে না। ক্লাস, পরীক্ষা, মূল্যায়ন করতে গিয়ে নতুন বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছেন শিক্ষা প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা। এমন দীর্ঘমেয়াদি মহামারীতে নিজেদের খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।

করোনার আঘাতে শিক্ষাব্যবস্থায় যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে অন্তত ৩ থেকে ৫ বছরের একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। আগামী দিনগুলোয় শিক্ষার আর্থিক, একাডেমিক, অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার জন্য এ পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। গেল বছরে মাত্র দুই-আড়াই মাস প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পর বন্ধ হয়ে যায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠা। এক বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষাঙ্গনে পদচারণা নেই কোনো শিক্ষার্থীর। একের পর এক নোটিশে বেড়েছে ছুটি। দৈনন্দিন লেখাপড়ার সূচিতে ছন্দপতন ঘটে প্রতিটি ছুটির ঘোষণায়। এতে করে অনিশ্চিত গন্তব্যের লেখাপড়া নিয়ে শিক্ষার্থীরা মানসিক অবসাদে ভুগছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আফরোজা হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকদিন পর দেখে তার স্কুল-কলেজ-বিশম্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করছে। এতে তার শিক্ষার প্রতিদিনের রুটিনে প্রভাব পড়ে। মনেও দাগ কাটে। তিনি বলেন, এখন করোনা পরিস্থিতির কারণে মানুষের ঘরবন্দি থাকা, জীবনের শঙ্কা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ- এগুলো এক সঙ্গে অথবা যে কোনো একটি বিষয় মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে টেলিভিশন দেখে মানসিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার বদলে ইতিবাচক চিন্তার প্রকাশ মনের অবসাদ দূর করতে পারে। পরিবারের সদস্যরা সন্তানদের সঙ্গে ব্যস্ত থেকে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন অভিভাবকরা, আবার সন্তানদের দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতেও পারেন। তা ছাড়া ফোনে আত্মীয়, স্বজন বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেও মনকে চাঙ্গা রাখা যায়।

করোনা সংক্রমণের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বইমুখী রাখতে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পাঠদান পরিচালনা করছে শিক্ষা প্রশাসন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ উদ্যোগে তা করছে। তবে এসব ক্লাসে গত বছরের শুরুতে যতটা আগ্রহ ছিল, সেটা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

এ প্রসঙ্গে অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, স্কুলের বাইরে যে শিক্ষাদান পদ্ধতি, এটি প্রকৃত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নয়। শিক্ষার্থীরা সরাসরি ক্লাসে ৪০ মিনিট বক্তব্যে ৫০ শতাংশ বুঝতে পারে না। টেলিভিশন আর অনলাইন ক্লাসের শিক্ষকদের বক্তব্যে কতটুকু বোঝে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তার পরও সরকার এটি করেছে শিক্ষার্থীরা যেন বইয়ের সঙ্গে লেখাপড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু একঘেয়েমির কারণে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে না। দিনাজপুরের একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক জয়নুল আবেদিন জানান, তার কলেজে এক সময়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ অনলাইন ক্লাসে অংশ নিলেও এখন অংশ নিচ্ছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।

গত বছরের ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ক্লাস সংসদ টেলিভিশনে প্রচার শুরু হয়; যদিও সেসব ক্লাস শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি।

এডুকেশন ওয়াচের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দূরশিক্ষণে (সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন) ৩১.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো ধরনের অনলাইন শিক্ষার আওতায় আসেনি। যেসব শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে, তাদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ ডিভাইসের অভাবে অংশ নিতে পারছে না। গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৬৮.৯ শতাংশ।

২০২১ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে নতুন পাঠপরিকল্পনা তৈরি করে। এমনকি মে মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে সিলেবাসের ক্লাস শুরুর কথা। কিন্তু এপ্রিলে করোনা দ্বিতীয় ঢেউয়ে কারণে আদৌ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবে খোলা হবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, প্রথম ধাপের করোনা সংক্রমণে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক পরিকল্পনা ছিল। এখন করোনা দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। আগের সবকিছু বাস্তবায়ন করতে পারব কিনা বলতে পারছি না। এখন আগের নিয়মে অনলাইনে টেলিভিশনে ক্লাস চলছে। আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য নিচ্ছি- এতে কী পরিমাণ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। তিনি বলেন, একের পর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন আসছে মহামারীর কারণে। এখন নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। সামনে এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষা রয়েছে। এটি নিয়েও যে পরিকল্পনা ছিল তাও বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব কি না, জানি না। সবকিছুই নির্ভর করবে সংক্রমণ পরিস্থিতির ওপর।

করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গত বছর প্রাথমিক-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অটোপাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ পদ্ধতিতে এইচএসসি ও সমমানের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের অটোপাস দিলেও কারিগরি ধারার শিক্ষার্থীদের সিলেবাস কমিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এক বছর অটোপাসের পর এবার কী হবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে শিক্ষা প্রশাসন।

গত বছর অটোপাস দিয়েও নিস্তার মেলেনি। অটোপাসের ফলে মেধাবৃত্তি প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা না হওয়ায় এই শ্রেণির শিক্ষার্থীর মেধাবৃত্তির জন্য মনোনীতি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষা প্রশাসন। মেধাবৃত্তি প্রদানের আগের নীতিমালা এক্ষেত্রে কার্যকর নয়। বিশেষ পাসের কারণে নতুন নীতিমালা প্রয়োজন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বৃত্তি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের যেহেতু পরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে বিশেষ বিবেচনায়। এরা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত কেন থাকবে? কী ভাবে কোন পদ্ধতিতে বৃত্তি প্রদান করা যাবে- তার জন্য নীতিমালারও প্রয়োজন।

ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু সব শিক্ষার্থী এ পদ্ধতি অংশগ্রহণ করার মতো সামর্থ্যবান নয়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এই প্রযুক্তিবান্ধব ডিভাইস ক্রয়ের ক্ষমতা নেই। আবার প্রতিদিন ইন্টারনেটের ডেটা বিল ব্যয় করার মতো সামর্থ্যও নেই অনেকের।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, শিক্ষার সুযোগসুবিধা গ্রহণের যে সমস্যা শহর থেকে গ্রাম এবং প্রান্তিক জনপদের শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী। শহরে বিদ্যুৎ সুবিধা থাকলেও অনেক গ্রামে অপ্রতুল। ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ আর প্রযুক্তিবান্ধব ডিভাইস না থাকায় শহর আর গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগসুবিধায় বৈষম্য বাড়ছে। এতে করে শিক্ষাগ্রহণে পিছিয়ে পড়ছে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থী। মহামারীতে আর্থিক সংকট আর সুযোগবঞ্চিত থাকায় বিগত সময়ের চেয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার।

চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ করার আন্দোলনকারী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সমন্বয়ক এমএইচ সোহেল বলেন, করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তীব্র সেশনজটে পড়ছেন উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীরা। তাদের লেখাপড়া জীবন দীর্ঘ হওয়ায় অনেকে সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারবে না। এখন আমাদের দাবির আরও একটি যৌক্তিক কারণ এটি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, করোনাকালে অনলাইনে ক্লাস চালিয়ে নিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আবার পরীক্ষাও নিয়েছে। তবে এটি আমাদের দেশের সার্বিক অবকাঠামোয় যথার্থ নয়। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার পরে দ্রুত সেশনজট কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, স্থগিত পরীক্ষাগুলো কীভাবে কম সময়ে নেওয়া সেটি পরিকল্পনা করবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতিগুলো চিহ্নিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর মঞ্জুর আহমেদ। তিনি বলেন, তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য একটি শিক্ষা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্তত তিন বছরের জন্য হলেও একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জরুরি। তবেই শিক্ষার ক্ষতিগুলো কাটানো যাবে। শিক্ষা পুনরুদ্ধারে যে বাজেট বরাদ্দ দরকার, সেটি করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে প্রতিষ্ঠানগুলোয় আর্থিক সহায়তা দরকার। শুধু আদেশ, নির্দেশপত্র জারি করে কেন্দ্রীয়ভাবে এই বিস্তৃত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যাবে না। এ জন্য যথাযথ মনিটরিং দরকার। প্রয়োজনে সরকার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা নিতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, করোনায় যে ক্ষতি হয়েছে তার মধ্যে বড় খাত হচ্ছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এর পর শিক্ষা। তবে অন্য খাত পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব নয়। কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত দুরূহ হবে। এর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এ জন্য এখনই সরকারকে একটি তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com