

চট্টগ্রামের উত্তর ও মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ ১০ আসনে আসন্ন নির্বাচনের আগে বিএনপি সংগঠনকে নতুনভাবে গুছিয়ে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল পর্যায়ের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক, সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার এবং স্থানীয় নেতাকর্মীর মনোবল ধরে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন প্রার্থীরা। দলটি পুরো অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি স্পষ্ট করছে। যদিও কিছু আসনে মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ
মতভেদ ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে, তবুও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছেন। দলের একাধিক শীর্ষ নেতা মনে করছেন, সময়মতো ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ের সংগঠন শক্তিশালী রাখতে পারলে চট্টগ্রামের উত্তর ও মহানগরের আসনগুলোয় বিএনপি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে।
এদিকে বিএনপির এই ব্যস্ত সময়ে মাঠে আগে থেকে সক্রিয় থাকা জামায়াত অভ্যন্তরীণ সংকটকে সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মিরসরাই, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড ও রাউজানসহ কয়েকটি এলাকায় বিএনপির দ্বন্দ্বকে নিজেদের পক্ষে টানতে কৌশল সাজাচ্ছে তারা। দুই দলের সমান্তরাল প্রচার এবং মাঠে দৃশ্যমান তৎপরতা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাাপূর্ণ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) : এ আসনে বিএনপির গ্রুপিং থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জামায়াত। আসনটিতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম অহ্বায়ক নুরুল আমিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুর রহমান। গত এক বছর ধরে জামায়াতের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা আছেন বিরামহীন প্রচারে।
মিরসরাইয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দের জেরে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে ৭ম সংসদ নির্বাচনে দলীয় কোন্দল ঠেকাতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এ আসনে প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে পরাজিত করেন। ভোটাররা মনে করছেন, এবার বিএনপি কোন্দল ঠেকাতে না পারলে উজ্জীবিত জামায়াতের হাতে এ আসনে ইতিহাসের বাঁক বদল হতে পারে।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) : বিএনপির বেশ কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও ব্যবসায়ী সরওয়ার আলমগীরকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এ আসনে প্রার্থী বদলের জোর দাবি উঠেছে। বিএনপির একটি পক্ষ কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহারকে প্রার্থী করার দাবি করছে। আজিম উল্লাহ বাহার ২০১৮ সালে এখানে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছিলেন।
এ বিষয়ে ধানের শীষপ্রার্থী সরওয়ার আলমগীর আমাদের সময়কে বলেন, ফটিকছড়িতে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। দল তৃণমূলের জনপ্রিয়তা দেখেই প্রার্থী দিয়েছে। যারা মিছিল-প্রতিবাদ করছে তারা মুষ্টিমেয় কয়েকজন, বাকিরা জামায়াতের। জামায়াত চাইছে বিএনপির ভেতরে ঢুকে বিভেদ সৃষ্টি করে নির্বাচনী সুযোগ নিতে।
ফটিকছড়িতে জামায়াতের প্রার্থী চট্টগ্রাম মহানগর সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমীন। অন্য দলের মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের মিজানুর রহীম চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের জুলফিকার আলী এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে আবদুল হামিদ প্রার্থী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) : বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেনি। জোটে সমাঝোতা হলে শরিক দলকে আসনটি ছেড়ে দিতে পারে বিএনপি। এখানে জামায়াতে ইসলামী উত্তর জেলা সভাপতি আলাউদ্দিন শিকদারকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান রাজনৈতিক তৎপরতার অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী আলোচনা মূলত বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরেই চলছে।
এবার মনোনয়ন চেয়েছিলেন বিএনপির আট নেতা। তারা হলেনÑ সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির দুই সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন ও তারিকুল আলম তেনজিং, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, ব্যবসায়ী নুরুল মোস্তফা খোকন, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু তাহের, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল, সাবেক ছাত্রদল নেতা রফিউদ্দিন ফয়সাল। তবে শেষ পর্যন্ত এ আসনটি বিএনপি
শরিক দল এলডিপিকে ছেড়ে দিতে পারে- এমন আলোচনাও আছে। এলডিপির পক্ষ থেকে এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন থেকে আমজাদ হোসেন এবং গণসংহতি আন্দোলন থেকে তাহসিন মাহমুদ প্রার্থী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) : চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাউদ্দিনকে বিএনপি এবং উত্তর জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। আসনটিতে শক্ত অবস্থান আছে সাবেক কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর। মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর থেকে তার অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে আসছেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই দফায় আসলাম চৌধুরী অনুসারী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাত নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এরপরও আসলাম চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচন করার। তিনি গত ১৬ বছরে প্রায় আটবছর কারাভোগ করেন।
আসলামপন্থি হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. কমল কদর আমাদের সময়কে বলেন, সীতাকুণ্ডে মাটি ও মানুষের নেতা আসলাম চৌধুরীর বিকল্প নেই। আমাদের শেষ কথা- আসলাম চৌধুরীকেই প্রার্থী চাই।
দল না চাইলে কিছুই করার নেই মন্তব্য করে বিএনপির প্রার্থী কাজী সালাউদ্দিন বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী দলীয় কোনো অনুষ্ঠানে যাননি আসলাম চৌধুরী। তাকে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি; কিন্তু নিতে পারিনি। এখন তাকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।
এ আসনে এনসিপি থেকে তানজিদ রহমান, গণসংহতি আন্দোলন থেকে জাহিদুল আলম আল জাহিদ, ইসলামী আন্দোলন থেকে দিদারুল মাওলা, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে আবুল আসাদ মো. জুবায়ের রেজভী মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) : বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হক ও সাবেক এমপি সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাও এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল মালেক চৌধুরী। এসএম ফজলুল হক বলেন, একজনকে প্রতীক দিলেও বিভিন্ন জায়গায় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী দলের প্রধানের কাছে আপিল জানাচ্ছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তনও হচ্ছে। এলাকার মানুষ সেভাবেই চিন্তা করছে। ফলে আমিও সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছি।
অন্যদিকে জামায়াতের একক প্রার্থী নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব না থাকায় আবদুল মালেক চৌধুরী প্রচারে সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের সাড়া পাচ্ছি।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) : বিএনপি কোনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। এখানে জামায়াতের প্রার্থী শাহজাহান মঞ্জুর। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে খুন, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের জনপদ হয়ে উঠেছে রাউজান। ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। যার বেশিরভাগই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর দ্বন্দ্ব এখানে প্রকাশ্যে। ফলে আসনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) : এ আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এখানে বিএনপিতে বড় ধরনের কোন্দল নেই। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থাকা দলের উপজেলা আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন বাহার মনোনয়ন না পাওয়ায় তার অনুসারীরাও মাঠে নেই। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জামায়াত সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) চট্টগ্রাম নগর সভাপতি ডা. এটিএম রেজাউল করিম।
আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের নির্বাচনী এলাকা এটি। তিনি পালিয়ে বর্তমানে ইউরোপ আছেন। সারাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের চরম খারাপ সম্পর্ক হলেও রাঙ্গুনিয়ার চিত্র ভিন্ন। এখানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীর রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এ নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) : এ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা না হলেও বর্তমানে প্রচার চালাচ্ছেন সম্ভাব্য চার প্রার্থী। তারা হলেনÑ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যবসায়ী শামসুল আলম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল আলম। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক।
আবু সুফিয়ান ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। এবার চট্টগ্রাম-৯ আসনে প্রচার চালানোর সমালোচনা করছেন অন্য প্রার্থীরা। আবুল হাশেম বক্কর মনে করেন চট্টগ্রাম-৮ আসনেই আবু সুফিয়ানের নির্বাচন করা উচিত। মহানগরে আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে আবু সুফিয়ানের দাবিÑ দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে তিনি প্রচার চালাচ্ছেন। এ আসনে তার নাম ঘোষণা করা হলেও পরে স্থগিত রাখা হয়। ২০০৮ সালে এ আসন থেকে নির্বাচন করা শামসুল আলম বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি এবং ধানের শীষে নির্বাচন করার কারণে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে গেলে ধ্বংসই করে দিয়েছে। দল আমাকে মূল্যায়ন করলে ইনশা আল্লাহ এ আসন উপহার দিতে পারব।’ জামায়াতের প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক বলেন, এক বছর ধরে আমাদের নেতাকর্মীরা নতুন উদ্দীপনায় কাজ করছেন। আমরা নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী।
চট্টগ্রাম-১০ (খুলশী-পাঁচলাইশ-পাহাড়তলী-হালিশহর) : এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ধানের শীষের হেভিওয়েট এ প্রার্থীর জয়ের লক্ষ্যে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা একাট্টা হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে জামায়াতের প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর, পতেঙ্গা) : এ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। তবে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু। নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইদ আল নোমানও আছেন মাঠে। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিউল আলম।