

কীর্তনখোলা নদীর তীরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। আজ ২২ ফেব্রুয়ারি এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ বছর পেরিয়ে ১৬তম বছরে পদার্পণ করেছে। অথচ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট, আধুনিক গবেষণাগারের অভাব, আবাসন সমস্যা এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে শিক্ষা ও গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এখানকার শিক্ষার্থীরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলে প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রত্যাশিত উন্নয়নের মুখ দেখেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে নতুন কোনো প্রকল্প আনতে পারেনি প্রশাসন।
এদিকে গত বছরের ১০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা শীর্ষক ৩ কোটি ৯ লাখ টাকা অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর সাত মাস অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটির কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। নতুন পরিস্থিতিতে এই প্রকল্প নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকট কাটানো কঠিন হবে। তাদের মতে, নতুন সরকারের বিশেষ নজর ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট এবং গবেষণা সুবিধা সংক্রান্ত সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
শ্রেণিকক্ষ সংকট:
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি অনুষদের আওতায় ২৫টি বিভাগের জন্য মাত্র ৩৬টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। অথচ ১০ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য কমপক্ষে ৭৫টি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন। কক্ষ সংকটের কারণে অনেক সময় খোলা মাঠে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হচ্ছে। অধিকাংশ বিভাগে সেশনজট বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুটি একাডেমিক ভবনে ২৮টি এবং প্রশাসনিক ভবনে ৮টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। অন্যদিকে ল্যাবের জন্য কক্ষ আছে ৩২টি। এ ছাড়া বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও শিক্ষকদের অফিস মিলিয়ে ৬৮টি কক্ষ রয়েছে। ফলে প্রতিটি কক্ষে তিন-চারজন শিক্ষককে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে।
আবাসন সংকট:
বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ২০৩১ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধাবঞ্চিত। তাদের বাধ্য হয়ে মেস ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের দুটি করে মোট চারটি হল রয়েছে। প্রতিটি আবাসিক হলে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ শিক্ষার্থী থাকছেন। ১ জনের আসনে থাকছেন ২ জন, ৪ জনের আসনে থাকতে হচ্ছে ৮ জনকে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষক সংকট:
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটও প্রকট। ১০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২১৯ জন। এর মধ্যে শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন মাত্র ৫৪ জন। সে হিসেবে প্রায় ৬৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা। এছাড়া অর্গানোগ্রাম-ভুক্ত অধ্যাপক পদের সংখ্যা ৪৯টি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র ১জন।
পরিবহন সংকট:
অপর্যাপ্ত বাস ও জনবল সংকটে বিপর্যস্ত ববির পরিবহন পুল। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র ২৫টি পরিবহন, অথচ চালক আছেন মাত্র ১১ জন। পরিবহন পুল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস রয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে বাস ১৩টি, মাইক্রোবাস ৫টি, জিপ ২টি, কার ১টি, অ্যাম্বুলেন্স ১টি ও মোটরসাইকেল ৩টি। যা একেবারেই প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ২০২০ সালের পর থেকে নতুন কোনো বাস বরাদ্দ আসেনি। বর্তমানে পরিবহন ক্রয়ের জন্য ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কারণে নতুন বাস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। চালক সংকট ও ত্রুটিপূর্ণ বাসের কারণে অনেক সময় নির্ধারিত ট্রিপ পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে।
বরিশাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, ‘২৬টি বিভাগের প্রতিটিতে মাত্র একটি করে ক্লাসরুম। প্রতি বিভাগে পাঁচ-ছয়টি ব্যাচ হওয়ায় ক্লাসরুম সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এক ব্যাচের ক্লাস চললে অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৫ বছরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অডিটোরিয়াম হয়নি। ছোট দুটি হলরুম আছে, সেগুলোও প্রায়ই নষ্ট থাকে। পর্যাপ্ত ল্যাব ও গবেষণা সরঞ্জাম না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক মুস্তাকিম মিয়া বলেন, ‘এক রুমে তিন-চারজন বসতে হয়। এতে অনেক সময় কোনো শিক্ষার্থী তার সমস্যার কথা বলতে পারে না। আবার ১০ থেকে ১৫টি কোর্স পড়াতে হয়। একজন শিক্ষকের ঘাড়ে অতিরিক্ত ৪/৫টি দায়িত্ব পালনের ভার থাকে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নতির অন্তরায়। এছাড়াও অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে শিক্ষকদের গবেষণা ও আত্মোন্নয়ন সম্ভব হয় না। তাই এসব সমস্যার আশু সুরাহা প্রয়োজন।’
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিচ্ছি। দ্রুতই শিক্ষার্থীরা দৃশ্যমান কাজ দেখতে পারবে।’