

ব্যক্তিগত অর্জনের মোহ কাটিয়ে অন্যের দুঃখ ঘোচানোর প্রচেষ্টাই শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। সংযমের মাসে অন্তরের সংকীর্ণতা বিসর্জন দিয়ে উদারতার চর্চা করলে হৃদয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি অনুভূত হয়। পার্থিব সম্পদের মোহ ত্যাগ করে অসহায়ের সেবায় আত্মনিয়োগ করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান। অভাবী মানুষের কল্যাণ কামনায় নিজেকে সঁপে দেওয়াই আল্লাহর নৈকট্য লাভের সহজ পথ। পবিত্র রমজান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, সাধ্যমতো দান-খয়রাত করা। রমজান মাসের দানে অন্য সময়ের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে অনেক দান করতেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ার সব মানুষ অপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন। রমজানে তার দানের হাত আরও প্রসারিত হতো। (সহিহ বুখারি ১৯০২)
আল্লাহতায়ালা যাদের বেশি সম্পদ কিংবা সচ্ছলতা দান করেছেন, তাদের জানা উচিত, এসব সম্পদ আল্লাহ কেবল পরীক্ষা হিসেবে দান করেছেন। তিনি দেখতে চান যে, যারা ধনী-সচ্ছল তারা দরিদ্র, অভাবী ও নিঃস্বদের দান করে কি না। মহান আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে নিজের প্রতিনিধি করেছেন। তাই বিচার দিবসে তিনি প্রশ্ন করবেন, দুনিয়াতে তুমি আমার প্রতিনিধি ছিলে, কিন্তু কেন আমার দেওয়া অর্থ ও রিজিক থেকে দরিদ্র ও ক্ষুধার্তদের সাহায্য করোনি?
সমাজের অনেকেই আল্লাহকে দোষারোপ করে এই বলে, তিনি কেন তাকে দরিদ্র রেখেছেন? এটা উচিত নয়, সহায়-সম্পদ পরীক্ষার বস্তু। তাছাড়া মানুষের ভোগ-বিলাস ও অন্যায়-অবিচার এবং বৈষম্যের কারণেই পৃথিবীতে অনেক মানুষ দরিদ্র ও নিঃস্ব। এ জন্য মহান আল্লাহ দায়ী নন। বিশ্বে যদি সম্পদের সুষম বণ্টন থাকত এবং সবাই যদি জাকাত, উশর ও ফিতরা ঠিকমতো আদায় করত তাহলে কেউ দরিদ্রই থাকত না। যারা অন্যদের প্রতি দয়া দেখান না, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালাও তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হবেন না।
রমজান মানুষকে সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়, ধৈর্য ও সংযম শিক্ষা দেয়। দান-খয়রাতের মাধ্যমে এ গুণের প্রকাশ ঘটে। যার মাঝে এসব বৈশিষ্ট্য থাকবে, সে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথ পাবে, আল্লাহতায়ালার দয়া ও রহমতের অধিকারী হবে এবং তারাই হবে সৌভাগ্যের অধিকারী। পবিত্র রমজান মাসে ভেবে দেখা উচিত, এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মধ্যে রয়েছে কি না। জাকাত দেওয়া বা দান-খয়রাতের ব্যাপারে কৃপণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে কি না? আমাদের উচিত, সক্ষমতা ও সামর্থ্য নিয়ে হীনম্মন্যতায় না ভুগে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র-অভাবী মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা। এর বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা আমাদের সামর্থ্য বাড়িয়ে দেবেন। তাছাড়া উপার্জনের একটি নির্দিষ্ট অংশ যদি নিয়ম করে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা যায়, এর উপকারিতা খুব দ্রুতই টের পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে উপার্জনে বরকত হয়।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় গমন করে সর্বপ্রথম যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন, তার মধ্যে একটি ছিল মানুষকে খাওয়ানো। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় এসে পৌঁছলেন, মানুষ তখন দলে দলে তার কাছে দৌড়ে গেল। বলাবলি হতে লাগল হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এসেছেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এসেছেন। অতএব, তাকে দেখার জন্য আমিও লোকদের সঙ্গে উপস্থিত হলাম। আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম যে এই চেহারা কোনো মিথ্যুকের চেহারা নয়। তখন তিনি সর্বপ্রথম যে কথা বললেন তা এই, হে মানুষ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান করো এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় (তাহাজ্জুদ) নামাজ আদায় করো। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সহি-সালামতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (জামে তিরমিজি ২৪৮৫) অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, তোমাদের মধ্যে উত্তম মানুষ তারা, যারা মানুষকে খাবার খাওয়ায়। (মুসনাদে আহমদ ২৩৯৭১)