

পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আর শান্তির বার্তা দিচ্ছে না। সেখানে এখন বারুদের গন্ধ, আসন্ন মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি। ইরান দীর্ঘ সময়ের নীরবতা ভেঙে এমন এক রণমূর্তি ধারণ করেছে, যা ট্রাম্পের সিলেবাস আর নেতানিয়াহুর আয়রন ডোম দুটোকেই খাদের কিনারে এনে দাঁড় করেছে। এটি কেবল দুটি দেশের যুদ্ধ নয়, এটি একটি পুরনো সাম্রাজ্যের অস্তমিত হওয়া এবং এক নতুন আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের মহাকাব্য। বর্তমানে ইরানের প্রধান রণকৌশল হলো, তাদের বিপুল পরিমাণ পুরনো ও সস্তা ড্রোন এবং মিসাইল দিয়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ব্যস্ত রাখা। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য, প্রতিপক্ষের দামি ইন্টারসেপ্টরগুলো ধ্বংস করা। যখন এই সস্তা অস্ত্রের আঘাতে ডিফেন্স সিস্টেমগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে, তখনই ইরান তাদের আধুনিক ও হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে মূল হামলা শুরু করবে। ইতিমধ্যেই ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তারা টানা তিন মাস পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে যেতে সক্ষম। কিন্তু এই সামরিক হিসাব-নিকাশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিভীষিকাময় মানবিক ট্র্যাজেডি। দক্ষিণ ইরানের ‘মিনাব’ অঞ্চলে সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় কয়েক ডজন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা আধুনিক যুদ্ধের নিষ্ঠুরতম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুদের নিথর দেহ উদ্ধারের দৃশ্যগুলো বিশ্ববিবেক নাড়িয়ে দিলেও, ক্ষমতার দাপটে আজ উপেক্ষিত। সবচেয়ে নিষ্ঠুর ভণ্ডামি পরিলক্ষিত হচ্ছে কূটনৈতিক মঞ্চে। যখন ‘মিনাব’ অঞ্চলে শিশুদের রক্তে পারস্য উপসাগর লাল হয়ে উঠছে, ঠিক তখন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প, শিশু অধিকার ও তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে আবেগঘন ভাষণ দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে লাশের স্তূপ আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে মানবাধিকারের এই বুলি, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে দরিদ্র দেশের শিশুর প্রাণের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বেশি মূল্যবান।
আমেরিকার এই যুদ্ধের পেছনে ট্রাম্পের জেদ এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা প্রধান ভূমিকা পালন করছে। ট্রাম্প ভেবেছিলেন, ইরান কেবল ইসরায়েলের সীমানায় আক্রমণ করবে এবং মাঝপথে আরব মিত্রদের ঘাঁটিগুলো সেই হামলা রুখে দেবে। কিন্তু ইরান এবার হিসাব পাল্টে দিয়েছে। গালফ দেশগুলো, যারা আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র, তারাই এখন ইরানের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু। কারণ এই দেশগুলোতেই আমেরিকার প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো অবস্থিত। ইরান খুব ভালো করেই জানে, আগে তাদের মিসাইলগুলো কাতার, দুবাই বা বাহরাইনের বেসগুলো থেকে আটকানো হতো। এখন সেই ঘাঁটিগুলোকেই অকেজো করে ইরান পথের কাঁটা সরিয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্পের জন্য এটি একটি বিশাল ‘মিসক্যালকুলেশন’ বা ভুল হিসাব, যা তিনিও সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। ইরানের এই পরিকল্পিত হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সুরক্ষিত আকাশ এখন অরক্ষিত। কাতারে মার্কিন এফ-ফিফটিন যুদ্ধবিমানের রহস্যময় অবতরণ বা বিমান দুর্ঘটনার সংবাদগুলো আসলে রাডার বিকল হওয়ার ফল। বাহরাইন ও কাতারের বেসগুলোতে থাকা বিলিয়ন ডলারের আর্লি ডিটেকশন সিস্টেমগুলো এখন অন্ধ। ফলে আকাশপথে উড়ন্ত বিমান নিজের না কি শত্রুর, তা বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছে কমান্ড সেন্টার। এই রাডারগুলো কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, রাশিয়া পর্যন্ত নজরদারি করত। এখন সেই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ধুলোয় মিশে গেছে। ইরান কৌশলে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেবল দামি অস্ত্র থাকলেই যুদ্ধ জেতা যায় না, বরং সঠিক সময়ে সঠিক পথে আঘাত করাই আসল রণনীতি। এদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধ অস্থিরতা তৈরি করেছে। ট্রাম্প নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি কোনো নতুন যুদ্ধে জড়াবেন না এবং আমেরিকান সন্তানদের ‘বডিব্যাগ’ হয়ে ফিরতে হবে না। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে খোদ রিপাবলিকান সমর্থকরাই তার ওপর ক্ষুব্ধ। এমনকি দলের নারী এমপিরা যখন যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প তখন তাদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিচ্ছেন। ট্রাম্পের এই স্বৈরাচারী আচরণ এবং অযৌক্তিক জেদ আমেরিকাকে এমন এক গভীর গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে, যেখান থেকে ফেরা কঠিন।
ইরান এ যুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে এবং তাদের সমরপ্রধানের সংবাদ সম্মেলন ছিল, এক সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। তারা এমন অস্ত্র বের করতে যাচ্ছে, যা বিশ্ব কখনো কল্পনাও করেনি। ট্রাম্পের ‘গাড়ল’ আচরণের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ আমেরিকান মা-বাবাদের, যাদের সন্তানরা আজ রাজনীতির শিকার। এই যুদ্ধের ফলাফল এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে, ইরানের অ্যাম্যুনেশনের পরিমাণের ওপর। যদি তারা কয়েক হাজার মিসাইল প্রস্তুত রেখে থাকে, তবে আধুনিক রাডারহীন পশ্চিমা ডিফেন্সের পক্ষে তাদের আটকানো অসম্ভব। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই বিশাল মিসক্যালকুলেশন কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো পশ্চিমা বিশ্বকেই জন্মের শিক্ষা দিতে যাচ্ছে। সম্ভবত পৃথিবী মাল্টি-পোলার বিশে^র দিকে যাচ্ছে। হয়তো মার্কিন একক আধিপত্যের যবনিকা ঘটছে তেহরানের এই প্রতিরোধের মাধ্যমে। তেহরান এখন হয়ে উঠছে আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র। যদি আমেরিকা বা ইসরায়েল ইরানের মূল স্থাপনায় আঘাত হানে, তবে ইরান হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতি অচল করে দেবে। পৃথিবী এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিনারে দাঁড়িয়ে। আগামী কয়েক সপ্তাহ হবে ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ। হয় বিশ্ব একটি নতুন ভারসাম্য খুঁজে পাবে, নয়তো ২০২৬ সাল আধুনিক সভ্যতার এক মহাপ্রলয়ের বছর হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্পেন, যারা আমেরিকাকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানিও সম্ভবত শিগগিরই নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। যুদ্ধের নেশায় মত্ত শক্তিগুলো হয়তো বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির হিসাব মেলাতে পারবে, কিন্তু মিনাবের সেই শিশুদের প্রাণের বিনিময়ে কোনো কিছু কি যথেষ্ট? ইতিহাস হয়তো ট্রাম্পের অহংকার আর নেতানিয়াহুর ধূর্ততাকে ঘৃণাভরে স্মরণ করবে, কিন্তু তার জন্য বিশ্বকে যে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে, তা অভাবনীয়। আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে শক্তির ভারসাম্য হয়তো চিরতরে বদলে যেতে পারে।