

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের পাল্টা কৌশল ও প্রতিরোধের কারণে ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা অব্যাহত থাকা, জ¦ালানি বাজারে অস্থিরতা এবং কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিস্থিতি এখন জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই বাস্তবতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা কৌশলগত চাপে পড়েছেন।
ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানে হামলা আরও জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, ইসরায়েলের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার জবাবে ইরানের ভেতরে আরও বিস্তৃত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হবে। সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা ইরানে পূর্ণ শক্তি দিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখব।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের কোম শহরে আবাসিক এলাকায় হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৯০০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ হাজার ইরানি।
অন্যদিকে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এক কর্মকর্তা ও এক সৈনিক গুরুতর আহত হয়েছেন। একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে সেনা সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন সেনাপ্রধান ইয়াল জামিল। তিনি মন্ত্রিসভাকে জানিয়েছেন, সেনা সংকটের কারণে খুব শিগগিরই সেনাবাহিনী সাধারণ অভিযানও চালাতে অক্ষম হয়ে পড়বে। তিনি দ্রুত নতুন সেনা নিয়োগ ও দায়িত্বকাল বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সরাসরি হুশিয়ারি দিয়েছে-মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেসব এলাকা থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরে যেতে বলা হয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, মার্কিন সেনাদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই হামলা চালানো হবে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসির জনসংযোগ শাখা বলেছে, ‘আমরা আপনাদের জোরালে পরামর্শ দিচ্ছি, যেখানে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, সেসব এলাকা আপনারা অবিলম্বে ত্যাগ করুন, যাতে আপনাদের কোনো ক্ষতি না হয়।’
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চালকবিহীন ‘ড্রোন স্পিডবোট’ মোতায়েন করেছে, যা নজরদারি ও সম্ভাব্য হামলায় ব্যবহৃত হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিস্ফোরকবাহী স্পিডবোট দিয়ে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের ব্যাপক ক্ষতি করার পর থেকে চালকবিহীন এ নৌযানগুলো আলোচনায় আসে। প্রায় এক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে ইরানও অন্তত দুবার পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য ‘সি ড্রোন’ বা সমুদ্র-ড্রোন ব্যবহার করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ¦ালানি তেল এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এ পথ কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তবে অনেক ক্ষেত্রে ইরান এখনও কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সস্তা ড্রোন, সমুদ্রমাইন এবং ভৌগোলিক অবস্থান তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এ অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
এ প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা কমাতে ইরানের জ¦ালানি স্থাপনায় হামলার সময়সীমা দশ দিন পিছিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে, যদিও সামগ্রিকভাবে দাম এখনও উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইরান কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৪ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে অতিরিক্ত ফিও আদায় করছে। ফলে যুদ্ধের মাঝেও ইরানের রাজস্ব প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে।
ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরব যখন উৎপাদন কমায় বা বিকল্প রুটের সন্ধানে হিমশিম খাচ্ছে, ইরান তখন নির্বিঘ্নে খারগ দ্বীপ ও জাস্ক টার্মিনাল ব্যবহার করে তাদের তেল বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। জাস্ক টার্মিনালটি হরমুজ প্রণালির বাইরে হওয়ায়, সেখান থেকেও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে তেহরান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। ইতোমধ্যে হাজার হাজার সেনা পাঠানো হয়েছে, আরও প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এমনকি ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কিছু অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনাও চলছে; যা বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এরই মধ্যে মার্কিন বাহিনীর ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ৫ হাজার মেরিন সেনা ও ২ হাজার প্যারাট্রুপারকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এখন আরও প্রায় ১০ হাজার সেনা তাদের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অর্থায়নে কেনা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র অন্যত্র (মধ্যপ্রাচ্য) ব্যবহার করা হতে পারে। এতে করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এদিকে সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে বিস্ফোরণ এবং ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। সৌদি আরবে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট একটি সংবাদ সংস্থা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় সুলতান আমির ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার কথা উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক জাহাজ এবং যুদ্ধবিমানের জ¦ালানির ট্যাংকে হামলার দাবি করেছে ইরানের সেনাসদর দপ্তর। বৃহস্পতিবার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে জাহাজ এবং ইসরায়েলের হাইফা বন্দরে ওই তেলের ট্যাংকে হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা।
পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। রাশিয়ার আহ্বানে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার বিষয়টি আলোচনায় আসবে। বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা এ বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারণ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত-তিন ক্ষেত্রেই ইরান এখন দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। আর এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি সামরিক সমাধান খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে-এই সংঘাত সহজে থামার নয়, বরং আরও দীর্ঘ ও জটিল হতে পারে।