শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৬ অপরাহ্ন

বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক শিক্ষা : সমতার স্বপ্ন, বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ

ড. মোহা. হাছানাত আলী
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার

রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কখনো কেবল সংসদ ভবনের নীতিনির্ধারণী টেবিলে তৈরি হয় না, তার সূচনা হয় একটি ছোট্ট শ্রেণিকক্ষের নীরবতায়। সেখানে একটি শিশু যখন প্রথম অক্ষর শেখে, তখন সে কেবল ভাষা আয়ত্ত করে না—সে শেখে পৃথিবীকে বুঝতে, মানুষকে চিনতে, নিজের ভেতরে সম্ভাবনার আলো জ্বালাতে। সে কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা কোনো সাধারণ শিক্ষাস্তর নয়, এটি একটি জাতির সভ্যতা নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর।

বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত যে শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা—সেটি আজ বহুধাবিভক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি। একই দেশের শিশু ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠছে—সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম, মাদরাসা ও এনজিও পরিচালিত স্কুল—যেন একটি নদীর স্রোত বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু তার মূলধারা কোথাও দুর্বল হয়ে গেছে। এই বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক শিক্ষা আজ কেবল প্রশাসনিক একটি জটিলতা নয়, এটি সামাজিক বৈষম্য, মানগত অসমতা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য একটি গভীর চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত তিন দশকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভর্তির হার বেড়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ ও উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটির বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষায় অধ্যয়ন করছে এবং এক লাখের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধারায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজারের বেশি এবং এখানে কর্মরত শিক্ষক প্রায় চার লাখের কাছাকাছি। ভর্তির হার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে—বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত নয়, বরং এটি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত, যার ফলে শিক্ষার মান, সুযোগ ও অভিজ্ঞতায় ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে মূলত পাঁচটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গ্রামীণ বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিশুর জন্য এটি প্রধান শিক্ষার মাধ্যম। বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি, মিড ডে মিলসহ নানা উদ্যোগের কারণে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। তবে অনেক বিদ্যালয়ে এখনো অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার মানগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা গত দুই দশকে শহর ও মফস্বলে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। এই স্কুলগুলো সাধারণত ইংরেজি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয় এবং পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করে। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার মানে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। শহরে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুদের একটি বড় অংশ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণ করে এবং শিক্ষার্থীদের একটি ভিন্ন শিক্ষাজগতে নিয়ে যায়। কিন্তু এর ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ দেশের মূলধারার শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে—এমন সমালোচনাও রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ইবতেদায়ি মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাও দেওয়া হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার গভীরতা ও আধুনিকতা সীমিত থাকে। এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয় দুর্গম অঞ্চল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে স্কুলবহির্ভূত শিশুদের শিক্ষায় এই উদ্যোগগুলো কার্যকর হয়েছে। বহুধাবিভক্ত শিক্ষায় সামাজিক ও শিক্ষাগত সংকট তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষাগত বৈষম্যের বিস্তার : একই দেশের শিশুরা যখন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা লাভ করে, তখন তাদের সুযোগ ও দক্ষতার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পাচ্ছে, সেখানে গ্রামের অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষাসামগ্রী নেই। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা সমাজে একটি অদৃশ্য শ্রেণিবিভাজন তৈরি করছে। মানগত অসমতা ও বহুধাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার ফলে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও সৃজনশীল শিক্ষা, কোথাও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা—এই ভিন্নতা শিক্ষার্থীদের সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংকট, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব, পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ নেই। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে। শিক্ষকসংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব প্রাথমিক শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শিক্ষার গুণগত মান অনেকাংশে নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষকের ওপর। কিন্তু অনেক শিক্ষক এখনো আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান না। ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্বের অনেক দেশ প্রাথমিক শিক্ষাকে একক কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করে। ফিনল্যান্ডে সব শিশু একই ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা পায়। ফলাফল—উচ্চমানের শিক্ষা, কম সামাজিক বৈষম্য ও  বিশ্বসেরা শিক্ষা ব্যবস্থা।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে মূলত শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সমন্বিত এবং মানসম্মত। এখন প্রশ্ন হলো, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী? বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কারের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন।

একীভূত প্রাথমিক শিক্ষানীতি গ্রহণ ও সব ধারার প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। অন্তত পাঠ্যক্রম, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান নির্ধারণে সমন্বয় করা প্রয়োজন। সরকারি বিদ্যালয়কে শক্তিশালী করা ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষায় সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা।

বাংলাদেশেও প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরো কার্যকর করতে পারে।

স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল পাঠ্যবই ও অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব।

শিক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজেরও দায়িত্ব। অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং নাগরিক সমাজকে শিক্ষার উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণে : সমতার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। একটি শিশুর শ্রেণিকক্ষ কেবল একটি ঘর নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের কর্মশালা। যদি সেই শ্রেণিকক্ষ বৈষম্যে বিভক্ত হয়, তবে ভবিষ্যৎও বিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি সেখানে সমতার আলো জ্বলে, তবে সেই আলোই একদিন পুরো জাতিকে আলোকিত করবে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষা সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হবে আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন। বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বিত ও মানসম্মত রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের শ্রেণিকক্ষে, আর সেই শ্রেণিকক্ষ যদি সমতার আলোতে আলোকিত হয়, তবে ভবিষ্যৎও হবে সমান উজ্জ্বল।

লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com