রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ন

ইরানের পক্ষে হুতিরা, যুদ্ধে নতুন মোড়

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার

ইরানের পক্ষে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন এক কৌশলগত মোড় নিয়েছে। তাদের এই অংশগ্রহণ শুধু ইসরায়েলের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ¦ালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

গাজা যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হয়। শুরুতে এসব হামলা খুব বেশি কার্যকর ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত হয়। তবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এসে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। একটি ড্রোন হামলা তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এতে হুতিদের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের এই হামলা ইসরায়েলের জন্য বড় সামরিক হুমকি না হলেও কৌশলগত চাপ তৈরির একটি কার্যকর মাধ্যম। তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়, যখন এই গোষ্ঠী লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এই রুটটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত হুতিরা প্রায় ২০০টি হামলা চালিয়েছে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজের ওপর। এতে ৩০টির বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত একটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ফলে বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, যা বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিতে যদি ইরান একযোগে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং হুতিরা লোহিত সাগরের রুট অবরুদ্ধ করে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খেতে পারে। কারণ এই দুটি পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ¦ালানি ও পণ্য পরিবহন হয়।

এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার-এর উদ্যোগে ইসলামাবাদে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ রবিবার ইসলামাবাদে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে যোগ দিতে ইতোমধ্যে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর লক্ষ্য যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আলোচনার পথ সুগম করতে ‘আস্থা তৈরি’র ওপর জোর দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী এক ফোনালাপে তিনি এ জোর দেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ইরানের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ দেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান তার গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।

অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। রাশিয়া থেকে উন্নত সংস্করণের শাহেদ ড্রোন ইরানে সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। আজারবাইজান হয়ে মানবিক সহায়তার নামে ট্রাকে এই ড্রোন পরিবহন করা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। এতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ খবরকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘অন্য কোনো দেশ ইরানকে যা-ই সরবরাহ করুক না কেন, তা আমাদের অভিযানের সাফল্যে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

একই সময়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ফ্রন্টে। লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ বাড়ছে। কুয়েতে ড্রোন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে লেবাননের ভূখণ্ডের আরও গভীরে ঢোকার চেষ্টা করছে। কিছু এলাকায় তারা সীমান্ত থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার (৪ দশমিক ৩ মাইল) পর্যন্ত ভেতরে অগ্রসর হয়েছে। গত শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননে লড়াই চলাকালীন একটি ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক ইসরায়েলি সেনা গুরুতর ও অন্য একজন মাঝারি ধরনের আহত হন। অন্য একটি ঘটনায় গতকাল শনিবার ভোররাতে দক্ষিণ লেবাননে অভিযানরত সেনাদের ওপর রকেট হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা গুরুতর ও আরও ছয়জন মাঝারি ধরনের আহত হন।

এদিকে, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় এর রাডার ব্যবস্থার ‘ব্যাপক ক্ষতি’ হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেএনএ (কুনা) জানিয়েছে, বিমানবন্দরটি ‘বেশ কয়েকটি ড্রোন হামলার শিকার’ হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে নিশ্চিত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

ইরানের মিত্র হুতি বিদ্রোহীরা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর ইয়েমেন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

এদিকে, ইরানের রাজধানী তেহরানে ‘সরকারের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। শনিবার ভোরে এ হামলা চালানো হয়। তেহরানে অবস্থান করা এএফপির এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলার সময় রাজধানী শহরটিতে প্রায় ১০টি বিস্ফোরণের বিকট শব্দ পেয়েছেন তিনি। আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীও দেখতে পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শুক্রবার বলেছেন, ইরানে আঘাত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনও ‘আরও ৩,৫৫৪টি’ লক্ষ্যবস্তু বাকি আছে। ট্রাম্প বলেন, ‘সেগুলো (ইরানে বাকি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা) খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। হামলায় ঘাঁটিতে থাকা অন্তত একটি সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত সেনাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা সংকটাপূর্ণ। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০৩ সেনা আহত হলেন।

ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে থাইল্যান্ডের তেলবাহী জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচলের বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন, এ চুক্তির ফলে জ¦ালানি আমদানির বিষয়ে যে দুশ্চিন্তা ছিল, তা দূর হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মিয়ামিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, চলতি সপ্তাহেই এই বৈঠক হতে পারে।

ইরানের পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এসব ‘অপরাধের’ জন্য ইসরায়েলকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমন প্রতিক্রিয়া জানান আরাগচি।

ইরান যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, স্থলবাহিনী ছাড়াই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। এই অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে, কয়েক মাস প্রয়োজন হবে না।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ‘অতিরিক্ত আশাবাদী’ অবস্থানের বিষয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস এমনটা জানিয়েছে।

এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন। ইরান যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে পেতে শুক্রবার তারা আলোচনা করে বলে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, দুই মন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল সামরিক-রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যে সংকট তৈরি হয়েছে ইরানের ওপর বিনা উসকানিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের ফলে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। এরপর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে- এমন দেশগুলোতে আক্রমণ শুরু করলে যুদ্ধ বিস্তৃত হয়। ইরান, রাশিয়া দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নানা নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে। চলমান যুদ্ধে ইরান রাশিয়া থেকে সহযোগিতা পাচ্ছে বলেও জানা যাচ্ছে।

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি রয়েছে। তার মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং জ¦ালানি সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি নেই।

ইরানকে ঘিরে এই বহুমাত্রিক সংঘাতে হুতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ গেম-চেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে তাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। যদি একযোগে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের রুট ব্যাহত হয়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com