রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

ইরানের আকাশেও ধরাশায়ী আমেরিকা

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার

কাগজের নৌকার মতো তলিয়ে গেল ‘অজেয়’ মার্কিন অহংকার। গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করে আসছিল, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ কেবলই তাদের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, ইরানের কোনো বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ মাটিতে সেই দম্ভোক্তি আছড়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। ২৪ ঘণ্টায় ইরানের আকাশসীমায় দুটি অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা ওয়াশিংটনের সেই ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তিকে রীতিমতো ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। সমরবিশারদরা বলছেন, অসম শক্তির এই লড়াইয়ে আকাশপথেও যে আমেরিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়, তেহরান তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। স্বয়ং মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এই মন্তব্য করেছে এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে।

শুক্রবার দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি)। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

দ্য ইকোনমিক টাইমসের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন এই যুদ্ধবিমানটিকে ঘায়েল করতে ইরান অত্যন্ত আধুনিক প্যাসিভ ইনফ্রারেড ডিটেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। সাধারণ রাডার ব্যবস্থা বেতার তরঙ্গের সাহায্যে শত্রুর বিমান শনাক্ত করে, যা বিমানের সতর্কতামূলক ব্যবস্থায় সহজেই ধরা পড়ে। কিন্তু প্যাসিভ ইনফ্রারেড ডিটেকশন ব্যবস্থা কোনো সিগন্যাল না ছড়িয়ে কেবল বিমানের ইঞ্জিনের নির্গত তাপ শনাক্ত করে কাজ করে। ফলে মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি কোনো সতর্কবার্তা পাওয়ার আগেই আচমকা হামলার শিকার হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আধুনিক রাডার, বৈদ্যুতিক নজরদারি এবং দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের এক সমন্বিত ‘লেয়ার্ড এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম’ ব্যবহার করে ইরান এ সফল হামলা চালিয়েছে।

সিএনএনের খবর অনুযায়ী, ওয়াশিংটন দাবি করছে, ওই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর এক পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে অপরজন এখনও নিখোঁজ। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একজন মাত্র পাইলটকে প্যারাসুট নিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তাকে ধরতে এখনও তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে ইরান। তাকে ধরিয়ে দিতে অর্থ পুরস্কারও ঘোষণা করেছে তেহরান। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ওই পাইলটকে উদ্ধারে তারাও জোর তৎপরতা চালাচ্ছে; প্রয়োজনে বড় অভিযানও চালানো হবে। তবে ইরানের মাটিতে পাইলট উদ্ধারের যে কোনো ধরনের অভিযানই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক বাজি হবে সেই দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন।

শুক্রবার দ্বিতীয় আরেকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান হামলার শিকার হয়। পারস্য উপসাগরে এ-১০ স্থল-আক্রমণকারী যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিমানটির বিধ্বস্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ না জানালেও ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আঘাতেই এটি সাগরে ডুবেছে। রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানটি গুলি করে নামানো হয়েছে নাকি যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এর পাইলটকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সিএনএন বলছে, এই দুটি ঘটনায় হয়তো সামরিকভাবে ইরান হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে যায়নি। তবে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অসম এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরাজেয়’ থাকার দাবি একেবারেই নির্ভেদ্য নয়।

যুদ্ধ শুরুর পাঁচ দিনের মাথায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের আকাশসীমার ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেবে। এটিকে তিনি ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আকাশসীমা’ বলেও আখ্যা দেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বারবার দাবি করে আসছেন, ইরানের কোনো বিমানবাহিনী বা বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেই। বুধবার রাতেও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি দম্ভভরে বলেছিলেন, ‘ইরানের রাডার শতভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। সামরিক শক্তি হিসেবে আমরা অপ্রতিরোধ্য।’ কিন্তু অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাই তাদের এই অতিরঞ্জিত দাবির অসারতা প্রমাণ করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এমন অতিরঞ্জিত সামরিক দাবির ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার দাবি করলেও পরে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে তা ভুল প্রমাণিত হয়। মার্কিন হামলায় একটি স্কুল ধ্বংসের দায়ও মিথ্যাভাবে ইরানের ওপর চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প। সর্বশেষ সিএনএনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ধ্বংস করার দাবি করলেও ইরানের অর্ধেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনও সম্পূর্ণ অটুট রয়েছে।

এমনিতেই এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে সমর্থন পাচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এর উদ্দেশ্য বারবার বদলাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হওয়া ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মার্কিনিরা মনে করছেন, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক চড়া মূল্য চোকাতে গিয়ে তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বারবার দাবি করছেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম নাকি তাদের সামরিক সাফল্য এড়িয়ে যাচ্ছে। স্থলবাহিনী না নামিয়েই তারা আকাশ ও জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় পর বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালির মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বা ইরানের আকাশসীমাÑ কোনোটির নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রের দাবির মতো অতটা নিরঙ্কুশ নয়।

এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কৌশলগত দিক নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অত্যাধুনিক বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থার মুখে নন-স্টিলথ (যা রাডারে ধরা পড়ে) যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই ঘটনাই তার প্রমাণ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভবিষ্যতে ইরানের আকাশে মনুষ্যবাহী যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে ড্রোন বা দূরপাল্লার অস্ত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক ও একতরফা সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ভেবেছিল, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে নিজের পায়ের তলায় পিষতে পারবে। কিন্তু তেরহান পশ্চিমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়েনি, নতুন সর্বোচ্চ নেতা, খামেনিপুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে উল্টো শিরদাঁড়া সোজা রেখে অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাঘাত করে যাচ্ছে তারা।

বিনা বাধায় দ্রুত জয় ছিনিয়ে আনার যে দিবাস্বপ্ন ট্রাম্প দেখেছিলেন, তা এখন এক প্রলম্বিত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমানের ধ্বংস হওয়ার চিত্র এখন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যবাদী নীতিরই পতন। সামরিক শক্তির জোরে একটি লড়াকু জাতিকে রাতারাতি বশ করার অন্ধ নীতি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আজ বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিল অক্ষরে অক্ষরে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com