

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্টে বলেছে, ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে তেল শেষ হয়ে যেতে পারে। জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় সরকার যে যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে আছে এটা বোঝা যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করার পরিকল্পনার কথা বলেছে। তবে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় অনলাইন ক্লাস কি আদৌ যৌক্তিক সমাধান? যেখানে সারাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, বড় বড় শপিং মল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে ধুন্ধুমার এসি, সেখানে অপেক্ষাকৃত কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন অনলাইনের আওতায় আনতে হবে? যদিও প্রতিবন্ধকতামূলক কিংবা আপৎকালে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা দেখেছি, কোভিডকালে অনলাইনে পাঠদান ব্যবস্থা চালু থাকলেও গ্রামের শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বলতে গেলে তাদের বেশির ভাগেরই শিক্ষাগ্রহণ ব্যাহত হয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগে অনলাইন ক্লাসে সব শিক্ষার্থীকে কম্পিউটার অথবা অন্য ডিভাইস ব্যবহার করে স্ক্রিনে হাজির করে শিক্ষা দান পদ্ধতি গ্রহণ করার মতো আর্থসামাজিক অবস্থা এখনও এ দেশের সব শিক্ষার্থীর নেই বলাই বহুল্য। কোভিডকালে দেশের প্রধান কয়েকটি শহর ছাড়া পুরো দেশে অনলাইন কোর্স-কারিকুলাম সফল হয়নি। ফাঁকিবাজি ছিল, ছিল শিক্ষকদের অদক্ষতাও। এটা হওয়ারই কথা। কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন এডুকেশন সফলতা পেলেও কোর্সের বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোয় অনলাইন ক্লাস করার ক্ষেত্রে প্রচুর প্রতিবন্ধকতা দৃশ্যমান।
ভৌত অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সব বিষয়ের শিক্ষকদের এ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের প্রস্তুত করাতে না পারলে যাবতীয় উদ্যোগ ব্যর্থ হতে বাধ্য। যেহেতু এটি কেবল তাত্ত্বিক বা হাতে-কলমে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা মাধ্যম নয়, তাই এর ত্রুটিপূর্ণ প্রয়োগও সুফল বয়ে আনতে ব্যর্থ।
যদিও সংকটের পরিমাণ বাংলাদেশের মতো নয়, তথাপি পৃথিবীর বহু দেশেই জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় রাত ৮টার মধ্যে শপিং মল বন্ধ, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার সীমিতকরণ এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে ক্লাস না করিয়ে বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদিবস এক দিন কমিয়ে সপ্তাহে চার দিন ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলো সমন্বয় করে ওই চার দিনে নেওয়া যেতে পারে।
তথ্যভিত্তিক সরকারি বা কোনো নির্ভরযোগ্য ডেটায় স্কুল বন্ধ করলে ঠিক কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না। তবে ভবন খাতেই সবচেয়ে বেশি জ্বালানি খরচ হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৫০ শতাংশ হয় ভবনে। আর একটি গবেষণায় এই ব্যবহারের হার ৫৫ শতাংশ বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, গরমে শীতের তুলনায় বিদ্যুতের ব্যবহার ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বেড়ে যায়।
এই বাড়তি চাহিদার বড় অংশ আসে কুলিং মেশিন ব্যবহার বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রক মেশিন থেকে। গবেষণাগুলোতে এর ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, দেশের কয়টি স্কুলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র রয়েছে? যেসব স্কুলে রয়েছে, সেসব অভিভাবকের তাদের সন্তানদের বিকল্প পদ্ধতিতে পাঠদানের সংগতি রয়েছে, যা দেশের লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা দিতে সক্ষম নন। তাই অনলাইনে পাঠদানের মতো উপযোগিতাহীন পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে বরং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কীভাবে পরনির্ভরশীলতা কমানো যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
আমাদের মূল সমস্যা অতিমাত্রায় তেলনির্ভরতা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ৩০ থেকে ৪৫ দিনের তেল মজুদ রাখতে পারে। স্বাভাবিক সময়ের ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট হলেও যুদ্ধের যে পরিস্থিতি তাতে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট। অথচ আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণÑ ৩২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সমস্যা হলো, এগুলো চালাতে তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা লাগে।
অন্যদিকে আমাদের সৌরবিদ্যুৎ এখন যা আছে, এর বড় অংশ বাসা-বাড়িতে উৎপাদিত, সরকারি উদ্যোগের নয়, যার আসল সক্ষমতা কত এখনও জানা যায়নি। কাপ্তাই বাঁধ থেকে আমরা পাই ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। যেখানে ভুটান আড়াই গিগাওয়াট জলবিদ্যুৎ (যুফৎড়বষবপঃৎরপ ঢ়ড়বিৎ ঢ়ষধহঃ) উৎপাদন করে, যা তাদের দেশের মোট চাহিদার বেশি। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ তারা ভারতে রপ্তানি করে। নেপাল আড়াই-তিন গিগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা মোট চাহিদার ৯০-৯৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৮০, জলবিদ্যুৎ থেকে ৫০, বায়ুবিদ্যুৎ (উইন্ডমিল) থেকে ৪৫ গিগাওয়াট উৎপাদন করে। তেলের বাইরে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে এসব জায়গা থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ৫০০ গিগাওয়াট ৎবহবধিনষব বা নবায়ণযোগ্য জ্বালানির দেশে পরিণত হবে। পাকিস্তানের জলবিদ্যুৎ থেকে ১২ গিগাওয়াট, সৌর থেকে ৩, বায়ু থেকে ২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পাকিস্তান সৌরবিদ্যুতে দ্রুত উন্নয়ন করছে।
বাংলাদেশের উচিত হবে রিনিউয়েবল এনার্জি বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। পৃথিবীর বহু দেশ তাদের পর্যাপ্ত তেলসম্পদ থাকার পরও রিনিউয়েবল এনার্জি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার বড় উদাহরণ সৌদি আরব। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা তাদের ৫০ শতাংশ জ্বালানি সৌর ও উইন্ডমিল থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
বাংলাদেশের এনার্জি সেক্টরে পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। সমস্যাসংকুল দেশে দুষ্কালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শর্ট টার্মে যে ধরনের ইফেক্টিভ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা সরকারকে নিতে হবে। তবে সরকারের উচিত হবে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
গাজী তানজিয়া : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক