রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫১ অপরাহ্ন

কবরই এখন শেষ ভরসা

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার

২০২৪-এ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের মামলার তদন্ত নিয়ে বিপাকে আছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের ‘জুলাই হত্যাকা-ে’র এসব মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তারা এখন গলদঘর্ম। আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে। ওইসব মামলায় আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, নেতাকর্মী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ লোকজনও আসামি হয়েছেন। লাশের ময়নাতদন্ত না থাকায় অভিযোগপত্র দিতেও পারছেন না তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তারা পড়েছেন মহাসমস্যায়। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের নজরে আনা হলে নড়েচড়ে বসেছেন তারা, পুলিশ সদর দপ্তরে হয়েছে বিশেষ বৈঠকও। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে নিহতের কবর পাওয়া যাবে, সেটিকেই ময়নাতদন্তের অংশ ধরে মামলার চার্জশিট দিতে হবে। বিভিন্ন থানা পুলিশ ছাড়াও পিবিআই, সিআইডি, এটিইউ ও র‌্যাব উল্লিখিত মামলাগুলোর তদন্ত করছে।

পুলিশের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত এবং যাদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে, সেসব হত্যা মামলার তদন্তে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী, এসব মামলায় মরদেহের গোসল ও দাফনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ ও স্থান নির্দিষ্ট করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। কবরের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। তারা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকায় এ ধরনের মামলায় প্রাথমিক আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ ও জনপ্রতিনিধিদের সনদের ভিত্তিতে হত্যার ঘটনা ও জড়িতদের শনাক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য এসেছে মানবিক দিক এবং দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হতে পারে। তবে এই ‘সহজ সমাধান’ আদতে বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এতদিন পর লাশ কবর থেকে তুলে এখন ময়নাতদন্ত করা একদিকে যেমন আবেগপ্রবণ পরিবারের জন্য কষ্টদায়ক, তেমনি ফরেনসিক ল্যাবের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আইনের চোখে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ছাড়া একটি হত্যা মামলা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।

নাম প্রকাশ না করে একজন অপরাধ বিশ্লেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি হত্যাকাণ্ড প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে হাজির করতে হয়। খুনের ঘটনা প্রমাণের জন্য প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যসহ প্রাসঙ্গিক সব ধরনের উপাদান প্রয়োজন হয়। আর হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ এবং ছবি ও ফুটেজ সংরক্ষণ জরুরি। পরে নমুনাগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। জুলাইয়ের হত্যা মামলাগুলো ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জরুরি হবে চার্জশিটে। একটি মামলার চার্জশিটে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে ওই মামলা থেকে আসামি খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারা অনুযায়ী, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক। যদি কোনো মামলায় এ রিপোর্ট না থাকে, তবে উচ্চ আদালতে শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা একে ‘প্রসিডিউরাল ল্যাপস’ বা পদ্ধতিগত ত্রুটি হিসেবে ব্যবহার করে মামলা খারিজ করার আবেদন করে বসবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে মামলার স্বার্থে লাশ উত্তোলনের অনুমতি দিচ্ছে আদালত। মৃত্যুর কয়েক মাস পর শরীরের টিস্যু বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পচে যায়। ফলে গুলির ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন আগের মতো স্পষ্ট থাকে না। কেবল হাড়ের আঘাত বা বুলেটের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা নরম কোষের আঘাত প্রমাণ করা এতদিন পর দুষ্কর।

পুলিশ সদরদপ্তরের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, মামলার তদন্ত নিয়ে আমরা এখনো সমস্যায় আছি। বেশিরভাগ লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি। এ নিয়ে আমরা বিশেষ বৈঠক করেছি। ওই বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লাশের কবরই এখন আমাদের শেষ ভরসা। কোনো কিছু পাওয়া না গেলে কবরকেই ময়নাতদন্তের অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ এ ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। চার্জশিট দিতে গেলে ময়নাতদন্তে কী আছে তা উল্লেখ করতে হয়।

পুলিশ সদরদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই হত্যা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব মামলার ময়নাতদন্ত নেই, সেখানে নিহতের কবর কোথায় আছে তা চার্জশিটে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। নিরাপরাধ লোকজন যাতে কোনো মামলায় আসামি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। আর মিথ্যা মামলা দিয়ে কেউ বাণিজ্য করলেও তাদেরও আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসছি।

ময়নাতদন্ত ছাড়াই অনেকের দাফন : সিআইডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্দোলনে নিহত অনেকের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের দ্রুত দাফনের কারণে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আবার পরিবারের ইচ্ছায় ময়নাতদন্ত না করার অনেক ঘটনাও আছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত না হওয়ায় হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে জটিলতা রয়েছে। কারণ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ ও আঘাতের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত প্রয়োজন। তা না থাকলে আসামি সুবিধা পেতে পারে। তিনি আরও বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করানো এবং মরদেহ গ্রহণ করা ব্যক্তির জবানবন্দি নিচ্ছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। নির্দেশনায় সরকারি কর্মচারীদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বা তাদের কাউকে সাক্ষী করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিকে দাফন করা এলাকার বা সংশ্লিষ্ট কবরস্থান সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি করপোরেশনের সনদ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করায় ঘটনাস্থল, দাফনের স্থান এবং সময়ের বিষয়ে প্রশাসনিক নথিপত্র নিশ্চিত করছেন তদন্তকারীরা। তা ছাড়া নিহত ব্যক্তির জীবিত ও মৃত অবস্থার ছবিও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

১৪০ মামলার অভিযোগপত্র : পুলিশ সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে এক হাজার ৮৪১টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে হত্যা মামলা ৭৬৬টি। এসব মামলার মধ্যে ১৪০টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে আসামি করা হয় এক হাজার ৯৪১ জনকে। আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম রয়েছে। তা ছাড়া ৩৭টি মামলায় দুই হাজার ১৮৫ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিট দেওয়া হত্যা মামলাগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, শেরপুর, ফেনী, চাঁদপুর, নোয়াখালী, পাবনা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, আরএমপিতে রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ধারার ৩৭ মামলা বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, নরসিংদী ও বরগুনা জেলায়। এসব মামলায় শুধু এসআই বা ইন্সপেক্টররাই তদন্ত করছেন না, সিনিয়র কর্মকর্তারাও সুপারভাইস ও তদন্ত করছেন। এ ছাড়া কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা এ মামলাগুলো মনিটরিং করছেন।

কথিত রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের বাণিজ্য : পুলিশ সদরদপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলা বাণিজ্য এখনো হচ্ছে। জুলাই হত্যা মামলার অনেক বাদীকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। যারা মিথ্যা মামলা বা নিরাপরাধ লোকজনকে আসামি করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন অর্থ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকারও তথ্য পেয়েছি।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের একটি ইউনিট তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে জুলাই আন্দোলনে আদালতে অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি ৫৬ শতাংশ মামলায়। আদালতে করা মামলার একটি বড় অংশই ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকার কালশীর ইসিবি চত্বরে হামলার অভিযোগে আড়াইশ আসামির বিরুদ্ধে করা একটি মামলার বাদী আব্দুল আজিজ ও সাক্ষীদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি ওই ইউনিটটি। বাকি ৪৪ শতাংশ মামলায় চার্জশিট দেওয়া হলেও সেখানকার বহু আসামিও প্রকৃত নয় বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।

এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে, তাদের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। গত এক বছরে ১৭৭ জনের নাম মামলার আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এখনো নানাভাবে জুলাই আন্দোলনের মামলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং টার্গেট করে হয়রানিমূলক মামলাও হচ্ছে। থানা পুলিশ ‘মামলা বাণিজ্য’ করছে। মাঠপুলিশ বাদীদের সঙ্গে যোগসাজশে আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের নানাভাবে চাপ প্রয়োগ ও অর্থ বাণিজ্য করছে। বিএনপি নেতাকে যুবলীগ নেতা বানিয়ে মামলার আসামি ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের টার্গেট করে মামলার ঘটনাও ঘটেছে। কোনো উপায় না পেয়ে নির্দোষ ব্যক্তিরা আর্থিক লেনদেনও করছেন।

চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি : রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। এজাহারে নাম অন্তর্ভুক্ত করার আগে ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অংকের অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মামলার সুযোগে প্রতারকরা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। যারা বিগত সরকারের লেজুড়বৃত্তিই করেনি, তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদরদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মামলা নিয়ে প্রতারকচক্র সক্রিয় ছিল। যারা এসব অপকর্ম করছে, তাদের নজরদারি করার পাশাপাশি আইনের আওতায় আনতে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধান ও জেলার এসপিদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলা করায় অনেক বাদী ইতোমধ্যে ফেসেছেন। ইতোমধ্যে একশর বেশি বাদীর বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা।

ফৌজধারী কার্যবিধি সংশোধন : আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠায় বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার এ ধরনের মামলা থেকে রেহাই দিতে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করেছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (ক) / ১৭৩ (অ) এ নতুন বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে পুলিশ কমিশনার, এসপি বা কোনো জেলার এসপি পদমর্যাদার কোনো পুলিশ কর্মকর্তার এখতিয়ারাধীন কোনো মামলার বিষয়ে তিনি যৌক্তিক মনে করলে তদন্ত কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর সেই মামলার তদন্তের ব্যাপারে প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিতে পারবেন। ম্যাজিস্ট্রেট তার বিবেচনা বলে নিরপরাধ ও যার বিরুদ্ধে ওই অপরাধের কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই, তাদের বিচার পূর্ববর্তী পর্যায়েই মামলা থেকে রেহাই দিতে পারবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com