

দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা ও নজরদারিতে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি সার্ভেলেন্স রাডারসহ কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভেলেন্স-এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (সিএনএস-এটিএম) অটোমেশন সিস্টেমের আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ও প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত আজ সকালে এর কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে দেশের আকাশসীমা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সুরক্ষিত, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে।
ফ্রান্সের থ্যালাস কোম্পানির স্থাপিত এই আধুনিক রাডারের সর্বোচ্চ কভারেজ প্রায় ২৫০ নটিক্যাল মাইল। ফলে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক আকাশপথেও বিমান চলাচলের গতিবিধি নির্ভুলভাবে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রাইমারি রাডার সরাসরি সিগন্যাল প্রতিফলনের মাধ্যমে বস্তুর অবস্থান নির্ধারণ করে আর সেকেন্ডারি রাডার বিমানের ট্রান্সপন্ডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চতা, গতি ও পরিচয় নিশ্চিত করে। দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ে নজরদারির নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা সুউচ্চ ভবনের কারণে রাডার সিগন্যালের প্রতিবন্ধকতা এবং ‘ব্ল্যাংক জোন’ সমস্যার সমাধানে বিমানবন্দরের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে মাল্টিল্যাটারেশন (এমএলএটি) সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এটি একাধিক গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে বিমানের সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে অবস্থান নির্ধারণ করে। ফলে কম উচ্চতায় উড্ডয়ন বা অবতরণরত বিমানও এখন নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব হচ্ছে।
শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের সার্বিক আকাশসীমা নজরদারি জোরদারে ঢাকা, সিলেট, সৈয়দপুর, বরিশাল ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে অটোমেটিক ডিপেনডেন্ট সার্ভেলেন্স-ব্রডকাস্ট (এডিএস-বি) সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানের জিপিএস-ভিত্তিক অবস্থান, গতি ও উচ্চতার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাউন্ড স্টেশনে পৌঁছে যায়, যা রিয়েল-টাইম মনিটরিংকে আরও কার্যকর করেছে।
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক কন্ট্রোল টাওয়ার ও অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার। এখানে সংযোজিত সিএনএস-এটিএম অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে ফ্লাইট স্ট্রিপ জেনারেশন, ট্রাফিক সিকোয়েন্সিং এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করছে।
ভয়েস ও ডেটা কমিউনিকেশন ব্যবস্থায়ও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। দেশের চারটি বিমানবন্দরে রিমোট কন্ট্রোল এয়ার-গ্রাউন্ড (আরজি-এজি) সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ভয়েস যোগাযোগ নিশ্চিত করে। পাশাপাশি ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (ভিএইচএফ) ও হাই ফ্রিকোয়েন্সি (এইচএফ) ট্রান্সমিটার-রিসিভারের মাধ্যমে দেশের আকাশসীমা এবং সমুদ্র অঞ্চলেও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) সম্প্রসারণের ফলে বিশাল সমুদ্রাঞ্চলের আকাশপথ নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে কক্সবাজার বিমানবন্দরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিএইচএফ ট্রান্সমিটার, এডিএস-বি এবং কন্ট্রোলার-পাইলট ডেটা লিংক কমিউনিকেশন (সিপিডিএলসি) সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে সমুদ্র অঞ্চলেও ভয়েস ও ডেটা উভয় ধরনের যোগাযোগ এবং সার্ভেলেন্স কভারেজ নিশ্চিত হচ্ছে।
দেশের সব বিমানবন্দরকে একক নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে ভেরি স্মল অ্যাপারচার টার্মিনাল (ভিস্যাট) স্থাপন করা হয়েছে এবং বিকল্প সংযোগ হিসেবে গ্লোবাল ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক (জিডবি�উএএন) রাখা হয়েছে। এতে করে ভয়েস, ডেটা ও সার্ভেলেন্স তথ্য তাৎক্ষণিক আদান-প্রদান সম্ভব হচ্ছে, যা এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য করেছে।
প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২১ সালের জুনে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর একই বছরের অক্টোবরে থ্যালাসের সঙ্গে চুক্তি হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে রাডার স্থাপন করা হয় এবং ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত আগস্ট থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম আমাদের সময়কে বলেন, রাডার ও অটোমেশন সিস্টেম বেশ কিছুদিন থেকেই চালু আছে। আজ উদ্বোধনের মাধ্যম আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল। তিনি বলেন, এখন কোনো বিমান বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করলে তা অদৃশ্য থাকার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী প্রতিটি বিমানের জন্য নির্ধারিত ওভারফ্লাইং চার্জ আদায় করা হয়। উন্নত সার্ভেলেন্স ব্যবস্থার ফলে এই রাজস্ব আহরণ আরও সুনিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে তা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) মানদণ্ড পূরণে এই সিএনএস-এটিএম আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প কেবল একটি রাডার স্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর।