

মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই দলই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে দাপট দেখিয়েছে। হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা ৫৫ রানে ৬ উইকেটের বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর দিনের শেষভাগে বাংলাদেশের টপঅর্ডার ব্যাটাররাও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেই প্রথম দিনটি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ।
হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সঙ্গে তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন দুটি করে উইকেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বার পেসাররা প্রতিপক্ষের এক ইনিংসের সব ১০টি উইকেট নিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসারদের এমন সম্মিলিত দাপটও বিরল ঘটনা।
তবে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় স্বস্তির বিষয় ছিল পেসারদের সাফল্যের পর ব্যাটারদের দৃঢ় জবাব। দিন শেষে ৯৬ রানে ১ উইকেট হারিয়েছে বাংলাদেশ। একমাত্র আউট হওয়া ব্যাটার সাদমান ইসলাম। এরপর তানজিদ হাসান ও মুমিনুল হক প্রায় ১৬ ওভার ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়ার করা মোট রানের প্রায় অর্ধেক তুলে নিয়েছেন।
দুজনই অফ স্টাম্পের বাইরের অনেক বল ছেড়ে দিয়েছেন, শরীরের কাছাকাছি আসা বলগুলো শেষ মুহূর্তে খেলেছেন এবং দারুণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাদের অবিচ্ছিন্ন ৬০ রানের জুটি বাংলাদেশকে দিনের শেষভাগে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।
প্রস্তুতি ম্যাচের ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক দিন পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এমন ঘুরে দাঁড়ানো তাই প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে উঠেছে।
এদিন হাসান মাহমুদ বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে প্রথম ঘণ্টা থেকেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলার পেছনে ছিল বাংলাদেশের তিন পেসারের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদ উদ্বোধনী ব্যাটার জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ধারাবাহিকভাবে একই জায়গায় বল করে আটকে রাখেন। অফ স্টাম্পের সামান্য বাইরে বারবার জোরে বল ফেলে পিচ থেকে বাড়তি নড়াচড়াও আদায় করেন তারা।
অস্থির ওয়েদারাল্ডকে একের পর এক বাইরে বেরিয়ে যাওয়া বলে প্রলুব্ধ করতে থাকেন হাসান। প্রথম ঘণ্টার শেষ দিকে বড় শট খেলতে গিয়ে অবশেষে তাঁর ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগান ওয়েদারাল্ড। এরপর নিজের পরের ওভারেই হেডকে ফিরিয়ে দেন হাসান। চারপাশ থেকে ভেতরের দিকে ঢোকানো বলে ব্যাট চালিয়ে নিজের স্টাম্পেই বল লাগিয়ে ফেলেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। এটি ছিল হাসানের পরিকল্পনায় পরিবর্তন, কারণ এর আগে তিনি মূলত ব্যাটার থেকে দূরে সরে যাওয়া বল করছিলেন।
সীম মুভমেন্ট পাওয়া উইকেটে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও উদ্দীপ্ত বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপও দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিশেষ করে মার্নাস লাবুশেন নিজের খেলা ২০টি বলের একটিতেও ঠিকমতো টাইমিং করতে পারেননি। এবাদতের বলে দ্বিতীয় স্লিপে বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে তাঁর ইনিংস শেষ হয়। উইকেট পাওয়ার পর এবাদতকে দেখা যায় বিমানবাহিনীর স্যালুট উদযাপন করতে।
প্রথম সেশনটি দাপটের সঙ্গে শেষ করে বাংলাদেশ। বিরতির ঠিক আগের শেষ বলে তাসকিন আহমেদ ক্যামেরন গ্রিনকে মিডউইকেটে ক্যাচে পরিণত করেন। দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে ক্যাচটি নেন মুশফিকুর রহিম। ফলে মধ্যাহ্ন বিরতিতে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৭৪ রান।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর পঞ্চম উইকেটে স্টিভেন স্মিথ ও অ্যালেক্স ক্যারি ৫৫ রানের জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেন। দুজনই আক্রমণাত্মকভাবে ড্রাইভ খেলছিলেন। তবে বাংলাদেশের বোলাররা বাউন্ডারি দেওয়া বন্ধ করে দিলে আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ।
এরপর ভেতরের কানায় বল লাগিয়ে ক্যারিকে বোল্ড করেন এবাদত। পরে সোজা বলের লাইন থেকে সরে না গিয়ে শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হন বিউ ওয়েবস্টার। তাসকিনের বল সরাসরি অফ স্টাম্পের ওপর আঘাত করে।
এরপর অস্ট্রেলিয়ার লেজের ব্যাটারদের একে একে ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। একই সঙ্গে নিজের শিকার তালিকায় যোগ করেন স্টিভেন স্মিথকেও। প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ক ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। এরপর বড় শট খেলতে গিয়ে স্টিভেন স্মিথ ও নাথান লায়নও ক্যাচ তুলে দেন। চা বিরতির পরই ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
বাংলাদেশের একমাত্র উইকেটটি নেন মিচেল স্টার্ক। তার বলে গালিতে ক্যাচ দেন সাদমান ইসলাম। এই উইকেটের মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটে কোনো বাঁহাতি বোলারের সবচেয়ে বেশি উইকেটের রেকর্ড এখন স্টার্কের দখলে। তিনি রঙ্গনা হেরাথের ৪৩৩ উইকেটের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন। টেস্টে মোট উইকেটের হিসাবেও ৪৩৪ উইকেট নিয়ে তিনি কপিল দেবের সঙ্গে যৌথভাবে অবস্থান করছেন।