রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

রংপুরে ৪ মরদেহ : ছাদে পড়েছিল শিক্ষকের মরদেহ, সিঁড়িতে স্ত্রী-কন্যার, খাটের নিচে ছেলের

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

নতুন দোতলা বাড়ি। কয়েক দিন ধরে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ভেতর থেকে নেই কোনো সাড়াশব্দ। শেষ পর্যন্ত স্বজনের সন্দেহে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ভাঙা হয় ঘরের দরজা। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক মরদেহ। কারো মরদেহ সিঁড়ির কাছে, কারো খাটের নিচে, আবার সাবেক শিক্ষকের মরদেহ পড়েছিল ছাদের এক প্রান্তে। এভাবেই সামনে আসে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা। গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়া মন্দিরসংলগ্ন দুইতলা বাড়িটি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী (১২)।

জানা গেছে, নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক। গত বছর শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর নগরীর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। আর ছোট ছেলে ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পুলিশের ধারণা, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ এবং টাকা-পয়সা ও গয়না রাখার স্থান ভাঙা থাকায় ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ডাকাতিই ছিল, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

স্থানীয়রা জানান, বাড়িটি কয়েক দিন ধরেই তালাবদ্ধ ছিল। পরিবারটি সম্প্রতি বাড়িটির দোতলায় বসবাস শুরু করেছিল। নিচতলা তখনো নির্মাণাধীন। নতুন এলাকায় হওয়ায় প্রতিবেশীদের সঙ্গেও পরিবারের খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। কয়েক দিন ধরে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে একপর্যায়ে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী সেখানে আসেন। বাড়িতে তালা দেখে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফটক বন্ধ পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়। পরে দরজা ভেঙে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সিআইডির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডটি তিন থেকে চারদিন আগে ঘটে থাকতে পারে। ফলে এতটা সময় ধরে একটি পরিবার নিখোঁজ থাকার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘটনাস্থলের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো, চারজনের মরদেহ এক জায়গায় ছিল না।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী প্রীতিলতার মরদেহ পাওয়া যায় দোতলার সিঁড়ির কাছে। মেয়ে প্রার্থীর মরদেহও সেখানে ছিল বলে জানানো হয়েছে। আর ছোট ছেলে আয়ুসের মরদেহ পাওয়া যায় একটি কক্ষের খাটের নিচে। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছাদের এক প্রান্তে পড়েছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে। ঘরের ভেতর ছিল পচা লাশের তীব্র গন্ধ। কাপড়চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। মেঝেতে পড়েছিল গয়নার বাক্স। বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রথম দেখাতেই ডাকাতির আলামত বলে মনে হয়েছে তদন্তকারীদের কাছে। তবে একটা প্রশ্নও উঠছে। ডাকাতির ঘটনা হলে পরিবারের চার সদস্যকে কেন এভাবে আলাদা আলাদা স্থানে পাওয়া গেল? তারা কি ডাকাতদের বাধা দিয়েছিলেন? নাকি হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু লুটপাট নয়, আরও কিছু?

রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী জানান, নিহতদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুরো বাড়ি তছনছ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার পর ঘটনাস্থলে গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল কাজ করেছে। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ক্রাইম সিন বিশ্লেষণের পর মৃত্যুর সময় ও হত্যার ধরন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com