

খুলনা নগরীতে মাদকের বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদকের বিকিকিনি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, নগরীতে মাদক বিক্রির ১১৭টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্পটে মাদককারবারের সঙ্গে জড়িত ২৭২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। চিহ্নিত স্পট ও মাদককারবারিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই তালিকার বাইরে আরও শতাধিক স্পট রয়েছে। যেগুলো থেকে খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি মাসোহারা নিয়ে থাকেন।
একাধিক সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদককারবারের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ মাদক বিক্রেতাদের পুঁজি দিয়ে ব্যবসায় উৎসাহিত করতেন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় মাদক বিক্রির বিনিময়ে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন। ওই সময় গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও কোডিন ফসফেটজাত মাদকের বেচাকেনা ছিল উল্লেখযোগ্য। তখন নগরীতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মাদক কেনাবেচা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাদককারবার নিয়ন্ত্রণে থাকা কথিত গডফাদারদেরও পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা গেছে।
সীমান্ত থেকে সড়ক-রেলপথে ঢোকে মাদক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে চোরাকারবারিরা সড়ক ও রেলপথে ফেনসিডিল ও ইয়াবা খুলনায় নিয়ে আসে। পণ্যবাহী বিভিন্ন পরিবহনে এসব মাদক পথের বাজার ও জিরো পয়েন্ট হয়ে নগরীতে প্রবেশ করে। এ ছাড়া বেনাপোল থেকে আসা কমিউটার ট্রেনেও মাদক ব্যবসায়ীরা ফেনসিডিল ও ইয়াবা নিয়ে এসে দৌলতপুর ও খুলনা রেলস্টেশনে নামে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর মাদক বিক্রির স্পটগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সরকার প্রধানের কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা তালিকাটি পাঠিয়েছেন। একই তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য মাদক স্পট
চিহ্নিত ১১৭টি স্পটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো- টুটপাড়া, গাছতলা, মহিরবাড়ি খালপাড়, ৫ নম্বর ঘাট, গ্রিনল্যান্ড বস্তি, জোড়াগেট, ১০ তলার পেছনের এলাকা, ৪ ও ৬ নম্বর ঘাট, হাসপাতাল রোড, নিক্সন মার্কেট, দারোগার বস্তি, বার্মাশীল রোডের পানির ট্যাংকি মোড়, নিরালা আবাসিক এলাকা, হাজীবাড়ির মোড়, সড়ক পরিবহন লীগের অফিসসংলগ্ন এলাকা, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, পীর খানজাহান আলী (রহ.) সেতু এলাকা, লবণচরা, মুক্তা কমিশনারের বাড়ির পাশের সুইচগেট, লবণচরা দারোগার লিজ এলাকা, মতিয়াখালী খালপাড়, মোহাম্মদনগর, জিরো পয়েন্ট, কৈয়া বাজার, ইসলামনগর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গিলেতলা, কুয়েট রোড, আটরা পালপাড়া, গাবতলা বিদ্যুৎ স্টেশন, গাবতলা শ্মশানঘাট, আলীম জুট মিল গেটসংলগ্ন এলাকা, ল্যাবরেটরি স্কুলসংলগ্ন এলাকা, সেনপাড়া দাউদের মাঠ, গাইকুড়, রায়েরমহল মুন্সিপাড়া, গাইকুড় মিল্ক ভিটা, আড়ংঘাটা প্রাইমারি স্কুল, চিত্রালী বাজার, মানসী বিল্ডিং এলাকা, বঙ্গবাসী স্কুল রোড, প্লাটিনাম ২ নম্বর গেট, খালিশপুর জুট মিল গেট, রায়েরমহল বাজার, খালিশপুর রেললাইন, আলমনগর বাজার, হার্ডবোর্ড ঘাট, নিউ পিপলস কলোনি, বৈকালি বাজার, কাস্টমঘাট, বয়রা বাজার, দৌলতপুর, সেনপাড়া, দৌলতপুর পেট্রোল পাম্প, স্পাহানি কলোনি ও মহেশ্বরপাশা কালীবাড়ি।
শর্ষের ভেতরেই ভূত খুলনা নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক এড. বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা মহানগরসহ জেলাজুড়ে প্রায় কয়েক শতাধিক মাদকের স্পট রয়েছে। প্রতিদিনই এসব স্পট থেকে প্রায় ৫-৭ লাখ টাকার মাদক কেনা-বেচা হচ্ছে। অধিকাংশ স্পটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে চলছে মাদক কেনা-বেচা। মাঝে মাঝে তারা দেখানো অভিযান চালায়, তাও যৎসামান্য কিছু মাদক উদ্ধার করে। কিন্তু প্রকৃত মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বচেষ্ট না। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অর্ধেক স্পটকেই আড়াল করে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে যে তালিকা দিয়েছে তাতে বোঝা যায় যে শর্ষের ভেতরেই ভূত রয়েছে।
ডোপ টেস্টেও মাদকের উপস্থিতি নগরীতে মাদকসেবনের বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে স্বাস্থ্য পরীক্ষাতেও। গত মাসের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় খুলনা জেনারেল হাসপাতালের সুপার ডা. রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, ওই মাসে ১৩৭ জনের ডোপ টেস্ট করা হয়। এর মধ্যে ৮ জনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ আসে। তাদের অধিকাংশই মরফিন ও গাঁজা সেবনকারী বলে সভায় জানানো হয়।
এদিকে, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মণ বলেন, নগরীকে মাদকমুক্ত করতে প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা অনেকেই আত্মগোপনে থাকলেও তারা পুলিশের অভিযানে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।