সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

এনালগ যুগের অবসান টেলিযোগাযোগে

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার

দেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এনালগ টিডিএম সিস্টেম পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এখন থেকে সকল আন্তঃসংযোগ বা ইন্টারকানেকশন ব্যবস্থা অত্যাধুনিক আইপিভিত্তিক ইন্টারকানেকশন পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। আর এরই মাধ্যমে প্রচলিত এনালগ ব্যবস্থা ‘টাইম ডিভিশন মাল্টিপ্লেক্সিং’ বা টিডিএম সংযোগের অবসান ঘটছে। আজ ৩১ আগস্টের মধ্যে সারা দেশে সকল প্রকার টিডিএম সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা কাট-অফ করার চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

সম্প্রতি বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় টিডিএম সংযোগ পুরোপুরি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৩০৯তম কমিশন সভায় এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ ৩১ আগস্টের মধ্যে এনালগ পদ্ধতির ‘টাইম ডিভিশন মাল্টিপ্লেক্সিং’ বা টিডিএম সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে বিটিআরসি। এই নির্দেশনার ফলে দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এনালগ যুগ থেকে পুরোপুরি আধুনিক আইপিভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হবে।

বিটিআরসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা, খুলনা এবং চট্টগ্রাম জোনের সকল আইসিএক্স অপারেটর ইতোমধ্যেই তাদের শতভাগ সংযোগ আইপিতে রূপান্তর করেছে এবং টিডিএম সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বগুড়া এবং সিলেট জোনে বিটিসিএল ও গেটকো টেলিকমিউনিকেশনের কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো আংশিকভাবে টিডিএম ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এর আগে এই সংযোগ স্থানান্তরের জন্য গত ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও বিটিসিএল তা পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। আজ ৩১ আগস্টই হবে শেষ সুযোগ। এর পর আর কোনোভাবেই এনালগ টিডিএম সংযোগ টিকিয়ে রাখা হবে না।

মূলত ইন্টারকানেকশন ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ এবং উন্নত করতে আইপিভিত্তিক পদ্ধতি চালুর প্রক্রিয়া কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল। তবে এবারই প্রথম কমিশন কঠোরভাবে সকল অপারেটরকে এই এনালগ সংযোগ থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। টিডিএম হলো একটি পুরোনো পদ্ধতি, যেখানে সময় ভাগ করে সিগন্যাল আদান-প্রদান করা হয় । বর্তমানের উচ্চগতির ডাটা এবং ভয়েস কল ট্রাফিকের জন্য এটি আর পর্যাপ্ত নয়। এর বিপরীতে আইপিভিত্তিক ইন্টারকানেকশন অনেক বেশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন।

বিটিআরসির তথ্যমতে, ইন্টারকানেকশন ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। ২৫৩তম কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, অভ্যন্তরীণ অফ-নেট, আন্তর্জাতিক ইনকামিং এবং আউটগোয়িং ট্রাফিক পরিচালনার জন্য সকল অপারেটরকে শতভাগ আইপিভিত্তিক ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এনালগ টিডিএম সিস্টেম পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই সময় থেকেই ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বগুড়া এবং সিলেট—এই পাঁচটি জোনে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছিল ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে রূপান্তরের কাজ শেষ হয়েছে, তবে কয়েকটি স্থানে এখনো এনালগ সংযোগ রয়েছে। রাজধানী ঢাকা জোনের আইপি মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শতভাগ শেষ হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, এই জোনের ২৪টি আইসিএক্স অপারেটর তাদের টিডিএম সিস্টেম ইতোমধ্যেই বন্ধ বা শাট-ডাউন করে দিয়েছে। খুলনা অঞ্চলেও প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হয়েছে। সেখানে ১৩টি আইসিএক্স অপারেটর টিডিএম সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আইপিভিত্তিক কার্যক্রমে পুরোপুরি চলে গেছে।

বন্দর নগরী চট্টগ্রাম জোনের ১২টি আইসিএক্স অপারেটর তাদের কারিগরি পরিবর্তন শেষ করেছে এবং এনালগ সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করেছে। উত্তরবঙ্গের বগুড়া জোনে কারিগরি রূপান্তর প্রায় শেষ পর্যায়ে হলেও এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। এই জোনে ১০টি আইসিএক্স অপারেটরের মধ্যে ৯টি ইতোমধ্যেই মাইগ্রেশন শেষ করেছে। তবে ‘আইসিএক্স গেটকো’ এখনো আইপিভিত্তিক মাইগ্রেশন শেষ করতে পারেনি এবং বর্তমানে তারা লিগ্যাসি টিডিএম ব্যবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সিলেট অঞ্চলেও বগুড়ার মতো একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ১১টি আইসিএক্স অপারেটরের মধ্যে ১০টি আইপিতে স্থানান্তরিত হতে পারলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল এখনো তাদের রূপান্তর প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি। বিটিআরসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিলেট এবং বগুড়া জোনে এখনো কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা থাকায় এবং বিটিসিএল সম্পূর্ণ প্রস্তুত না হওয়ায় এই অঞ্চলে আংশিকভাবে টিডিএম ব্যবস্থা সচল রয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, এই মাইগ্রেশন না হওয়ার কারণে সামগ্রিক অফ-নেট কল রাউটিং বা টেলিযোগাযোগ ট্রাফিকের ওপর কার্যত কোনো প্রভাব পড়ছে না।

বিটিআরসির ২৫৩তম সভায় পর্যায়ক্রমে পুরোনো টিডিএম সংযোগ বন্ধ করার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকে দেশের বিভিন্ন জোনে অপারেটরদের টিডিএম সংযোগ থেকে আইপিভিত্তিক সংযোগে স্থানান্তরের জন্য একাধিকবার সময়সীমা নির্ধারণ ও পুনর্বিন্যাস করা হয়।

কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এনালগ টিডিএম সিস্টেম পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই সময় থেকেই ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বগুড়া এবং সিলেট—এই পাঁচটি জোনে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছিল। সর্বশেষ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও কয়েকটি অপারেটরের কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সিলেট ও বগুড়া জোনে টিডিএম সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষস্থানীয় তিন মোবাইল অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা এবং বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস ইতোপূর্বেই কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, টিডিএম সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আইপিভিত্তিক আইসিএক্স অপারেটরদের সঙ্গে ট্রাফিক আদান-প্রদান শুরু করেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড ঢাকা জোনে মাইগ্রেশন শেষ করলেও সিলেট অঞ্চলের এসবিএন সাইটে তাদের কার্যক্রম এখনো পেন্ডিং অবস্থায় রয়েছে।

বিটিসিএল বর্তমানে তাদের ‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটি শক্তিশালীকরণে সুইচিং ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, বগুড়া ও সিলেট অঞ্চলে আইপিভিত্তিক এক্সচেঞ্জ স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিটিসিএল জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই ট্রাঙ্ক গ্রুপ গঠন করেছে এবং চলতি মাসের মধ্যে তারা বগুড়া ও সিলেট জোনে আইপিভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে।

কমিশন সভায় বিস্তারিত আলোচনার পর আইপিভিত্তিক ইন্টারকানেকশন বাস্তবায়ন এবং টিডিএম সিস্টেম পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা দেশে আইপিভিত্তিক ইন্টারকানেকশন বাস্তবায়ন ও কার্যক্রম পরিচালনা করার বিষয়টি কমিশন নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। সারা দেশে টিডিএম সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা শাট-ডাউন করার জন্য আজ (৩১ আগস্ট) চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৩১ আগস্টের পর (আজকের পর) আর কোনো টিডিএম সংযোগ সচল রাখার সুযোগ থাকবে না। এই সময়ের মধ্যে যে সকল অপারেটর বা আইসিএক্স আইপি মাইগ্রেশন সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে গ্রাহকরা উন্নত মানের ভয়েস কল এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ সুবিধা পাবেন, যা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিআরসির এই কঠোর অবস্থানের ফলে অপারেটররা বাধ্য হয়েই তাদের কারিগরি আধুনিকায়ন সম্পন্ন করবে। টিডিএম সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেলে কল ড্রপ কমে আসবে এবং ভয়েস কোয়ালিটি অনেক বাড়বে। এ ছাড়া আইপিভিত্তিক ব্যবস্থায় কল রাউটিং অনেক দ্রুত হয়, যা অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় কমাতেও সহায়ক হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com