

রাজধানী ঢাকায় ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মাঠপর্যায়ের একটি নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের পাশাপাশি এর নির্দেশনা ও অর্থের উৎস নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের পর গতকাল যাত্রাবাড়ীতে চারজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়। পুলিশের দাবি- গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য এবং তাদের একজনের বিদেশে থাকা দলটির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকায় একের পর এক নাশকতার নাটাই বিদেশে। স্থানীয় নেটওয়ার্ক বিদেশ থেকে আসা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর হাইকোর্ট ও সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দুপুর সোয়া ১টার দিকে হাইকোর্টের সামনে এবং এর কিছুক্ষণ পর শিল্পকলার সামনে বিস্ফোরণ হয়। এর আগের রাতে শাহবাগের তিন নেতার মাজারের পাশে ও কমলাপুর রেলস্টেশনের একটি প্ল্যাটফর্মে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে- রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে এসব ঘটনা ঘটছে, নাকি এর পেছনে সমন্বিত কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে? আর মাঠের কর্মীদের নির্দেশনা যদি বাইরে থেকে এসে থাকে, সেই নির্দেশনা কীভাবে পৌঁছাচ্ছে, অর্থই বা আসছে কোন পথে? এ ব্যাপারে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের একাধিক টিম কাজ করছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোল্লা মো. শাহীন গতকাল রবিবার মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে জানান, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রথমে রায়হান উদ্দিন নামে একজনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগের জেএন সাহা রোডে একটি বাসার নিচতলার পার্কিংয়ে ইটের খোয়ার বস্তা থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়। পরে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে।
এরপর ডেমরার ডগাইর এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাসেল খান, আলাউদ্দিন ও আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী চারজনই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। রায়হান বংশাল থানাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন বলেও জানানো হয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে।
ডিবি বলছে, রায়হান এর আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় পাঁচ মাস কারাগারে ছিলেন। জামিনে বের হওয়ার পর আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি এসেছে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের যোগাযোগ বিশ্লেষণ থেকে। ডিবির কর্মকর্তার ভাষ্য, বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে রায়হানের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেই যোগাযোগের প্রকৃতি কী, কার সঙ্গে কী ধরনের নির্দেশনা আদান-প্রদান হয়েছে এবং তা সরাসরি ককটেল বিস্ফোরণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা— এসব এখনও তদন্তাধীন।
রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধরনেও একটি বিষয় চোখে পড়ছে। শহরের একাধিক প্রান্তে অল্প সময়ের ব্যবধানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে। ১৮ সেপ্টেম্বর মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, মগবাজার ও বিটিভি ভবনের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। ওই দিন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়।
পরদিন শনিবার সকাল থেকে রাজধানীজুড়ে ২৪৬ পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বসায় পুলিশ। তারপরও থামেনি ককটেল হামলা। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণে এক অটোরিকশাচালক আহত হন। রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের একটি নির্জন প্ল্যাটফর্ম এবং শাহবাগের তিন নেতার মাজারের পাশেও বিস্ফোরণ ঘটে। শনিবার সন্ধ্যা ও রাতে মিরপুর, মধ্যবাড্ডা ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- বিদেশে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে নাশকতা চালানোর অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিদেশ থেকে অর্থ সহায়তার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদেশে থাকা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি সাম্প্রতিক প্রতিটি বিস্ফোরণের নির্দেশ দিয়েছেন— এমন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, অর্থের লেনদেন, নির্দেশনার ধরন এবং মাঠপর্যায়ের হামলাকারীদের সঙ্গে সমন্বয়ের তথ্য যাচাই করাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য- এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটানোর চেয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করাই অন্যতম উদ্দেশ্য। একাধিক এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে রাজধানীর মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। পুলিশ বলছে, গত দুই-তিন দিনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাটিও তারই অংশ।
এ কারণে তদন্ত এখন শুধু বিস্ফোরণস্থল বা হামলাকারী শনাক্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কে ককটেল তৈরি করছে, কোথায় মজুদ করছে, কারা পরিবহন করছে, হামলার স্থান কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং মাঠের কর্মীদের কাছে নির্দেশনা কীভাবে পৌঁছাচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পর রাজধানীর প্রবেশ ও বহির্গমনপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, উড়ালসড়ক ও প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু নিরাপত্তা জোরদারের মধ্যেও শনিবার রাতে এবং গতকাল রবিবার দিনে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে গোয়েন্দা নজরদারির সক্ষমতা নিয়ে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, রেলস্টেশন, আদালত এলাকা ও ব্যস্ত সড়কের আশপাশে বিস্ফোরণ ঘটানোয় বোঝা যাচ্ছে, ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দ্রুত হামলা চালিয়ে সরে যাওয়ার কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার এবং চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার হওয়া তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ককটেল সরবরাহকারী, অর্থদাতা, নির্দেশদাতা এবং অন্যান্য সহযোগীর পরিচয় বের করার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে ডিবি।
তদন্তকারীদের সামনে এখন মূলত তিনটি প্রশ্ন- ঢাকার মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ধরন কী এবং সেই যোগাযোগের সঙ্গে নাশকতার প্রত্যক্ষ যোগসূত্র কতটা?
পুলিশের তদন্তকারীরা বলছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, রাজধানীর সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণগুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে দেশ-বিদেশে বিস্তৃত একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক। আপাতত ডিবির তদন্তে বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের যে তথ্য এসেছে, সেটিই সেই নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তারের একটি সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এর পূর্ণ চিত্র পেতে তদন্ত ও প্রমাণের অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।