আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র অস্থিরতা, ক্রমাগত লোকসান এবং আকাশচুম্বী ভর্তুকির চাপ সামলাতেই সরকার বাধ্য হয়ে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কষ্টের কথা স্বীকার করে তিনি এই কঠিন ও অজনপ্রিয় পরিস্থিতিটি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখার জন্য দেশবাসীর প্রতি বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও নীতিগত কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। গত রোববার রাতে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়, যা গত সোমবার থেকে সারাদেশে কার্যকর হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে বৈশ্বিক কাঠামোগত বাস্তবতার ব্যাখ্যা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দর মাঝেমধ্যে সাময়িকভাবে সামান্য কমলেও সার্বিক বাজার এখনও চরম উদ্বায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
তিনি জানান, এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের লোহিত সাগর ও বাব এল মানদেব প্রণালীর নিরাপত্তা সংকট, হুথি আক্রমণ, সৌদি আরবের তেল সরবরাহে সীমাবদ্ধতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে আরও বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাতে সরকারের বিশাল আর্থিক লোকসানের হিসাব প্রকাশ করে জাহেদ উর রহমান জানান, মূল্যবৃদ্ধির আগে লিটারপ্রতি ডিজেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল। ফলে কেবল ডিজেল খাতেই প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছিল। বর্তমানে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তবে এর মাধ্যমে বার্ষিক লোকসান অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য রাখা ৪৮ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির অর্ধেকই প্রথম আড়াই মাসে খরচ হয়ে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে কেবল জ্বালানি খাতেই সরকারের মোট দেনা সোয়া এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। এর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকা সত্ত্বেও সরকার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা না করে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, যুক্ত রাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও ভোটের কথা চিন্তা করে তেলের দাম বাড়াতে চান না। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ ভুলে এ ধরনের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন, বর্তমান সরকার কোনো প্রহসনের নির্বাচন করবে না। ফলে জনগণের অসন্তোষের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এই কঠোর পথ বেছে নিতে হয়েছে।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ওএমএসের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি, গণপরিবহনের ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং নতুন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এ জাতীয় আরো খবর..