বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

দেউলিয়া ঘোষণা চান ১৯৭ ঋণখেলাপি

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার

কোটি কোটি টাকার ঋণ। ব্যাংক ও পাওনাদারের চাপ। ঋণ আদায়ে চলছে মামলা। ব্যবসায় লোকসান কিংবা ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার কথা জানিয়ে এখন নিজেকেই দেউলিয়া ঘোষণা করতে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন ঋণখেলাপিরা। ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে এমন ১৯৭টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরেই দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেছেন ৪৬ ঋণখেলাপি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য দেউলিয়া আইন একটি আইনি সুযোগ। তবে একশ্রেণির ঋণখেলাপি এই সুযোগের অপব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করছেন। আবার কেউ আত্মীয়স্বজন বা অন্যের নামে সম্পদ গড়ে পরে কম সম্পদ দেখিয়ে দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করছেন। তাদের মতে, দেউলিয়া মামলা গ্রহণের আগে আবেদনকারীর প্রকৃত সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। সম্পদের তথ্য গোপন করে দেউলিয়া হওয়ার চেষ্টা করলে আইনে শাস্তির বিধানও রয়েছে।

ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতের সেরেস্তাদার মো. মানিক বলেন, গত আগস্ট পর্যন্ত আদালতে মোট ১৯৭টি দেউলিয়া মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলায় সবাই নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করেছেন।

তিনি বলেন, চলতি বছরে মোট ৪৬টি মামলার আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন ঋণখেলাপির ঠিকানাসহ তথ্য সঠিক না থাকায় তার আবেদন খারিজ হয়েছে। আরেকজন ঋণখেলাপি নিজের আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গত বছর দেউলিয়া আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য ৮১ জন আবেদন করেছিলেন।

দেউলিয়াবিষয়ক আইন, ১৯৯৭ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার দেনা পরিশোধে অক্ষম হলে এবং আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য দেউলিয়া আদালতে আবেদন করতে পারেন। আবেদনে তার সব পাওনাদারের নাম এবং তাদের পাওনা ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করতে হয়। একই সঙ্গে ওই ঋণ পরিশোধে তিনি অক্ষম—এ বিষয়টিও আবেদনে জানাতে হয়।

আদালত আবেদনটি গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট পাওনাদারদের কাছে সমন পাঠানো হয়। এরপর বিবাদীরা লিখিত জবাব দেন। পরে মামলার সাক্ষ্য, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে আদালত দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারেন।

কেউ দেউলিয়া ঘোষিত হলে তাকে দায়মুক্তির জন্য আদালতে আবেদন করতে হয়। এরপর আদালত নিয়োজিত রিসিভার দেউলিয়া ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন।

সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারের দায় পরিশোধের পরও অর্থ অবশিষ্ট থাকলে আদালত তাকে দায়মুক্ত ঘোষণা করতে পারেন। আর পাওনাদারের পাওনার তুলনায় সম্পদের পরিমাণ কম হলে তাকে দায়গ্রস্ত দেউলিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।

দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তির ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধও থাকে। তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যেতে পারেন না। নতুন ব্যাংকঋণ নিতে পারেন না। কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালকও হতে পারেন না।

আইনে দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তির জন্য শাস্তির বিধান না থাকলেও সম্পদের তথ্য গোপন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। কেউ সম্পদ গোপন করে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করলে পরে সেই সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে তার দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

মেসার্স সাহিন ট্রেডিং ও সাহিন স্টিল ওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী মো. শাহিন হোসেন (৪৭)। তার ঋণের পরিমাণও কোটি কোটি টাকা। ব্যবসা সম্প্রসারণ ও পরিচালনার জন্য তিনি সিটি ব্যাংক লিমিটেড থেকে বিভিন্ন সময়ে ঋণ নেন।

মামলার আবেদনে শাহিন উল্লেখ করেছেন, সুদসহ তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ২৭৫ টাকা। ব্যবসায় লোকসানের কারণে তিনি ওই ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি।

সিটি ব্যাংক ছাড়াও তার আরও অনেক পাওনাদার রয়েছেন। পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য তারা বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন বলে মামলায় উল্লেখ করেছেন শাহিন। তার দাবি, এ পরিস্থিতিতে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বাইরে বের হতে পারছেন না। কোনো উপার্জনও করতে পারছেন না। এতে তার পরিবার চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে।

এ অবস্থায় নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে আদালতে আবেদন করেন শাহিন। চলতি বছরের ২২ জুলাই ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে দেউলিয়াবিষয়ক আইন, ১৯৯৭-এর ১০ ধারায় তিনি মামলা করেন। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে সিটি ব্যাংক লিমিটেডকে।

মামলার আবেদনে শাহিন আরও জানান, তার নামে কোনো পৈতৃক সম্পদ নেই। তার ব্যবহারিক জিনিসপত্র বিক্রি করলে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে। সিটি ব্যাংকের সুদসহ পাওনা টাকা পরিশোধে তিনি একেবারেই অক্ষম দাবি করে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করার আবেদন জানান শাহিন।

আদালত মামলার নথি পর্যালোচনা করে গত ২৭ আগস্ট ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ধার্য তারিখে একটি প্রতিবেদন আদালতে আসে। তবে আরেকটি প্রতিবেদন না আসায় মামলার পরবর্তী তারিখ আগামী ১৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

শাহিনের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী শিহাব শাহরিয়ার বলেন, বাদীপক্ষ থেকে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর সময় দিচ্ছিল না। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও করা হয়েছে। এ কারণে তিনি দেউলিয়া আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

আইনজীবী বলেন, নারায়ণগঞ্জে শাহিনের একটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। আরও কিছু সম্পদ ব্যাংকের কাছে বন্ধক রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বন্ধক রাখা সম্পদ নিয়ে নিলেও তার কোনো আপত্তি নেই। তবে তিনি পাওনা পরিশোধে একেবারেই অক্ষম।

এ আইনজীবী আরও বলেন, কেউ আসলে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে চান না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার পিঠে দেয়াল ঠেকে যায়। দেউলিয়া ঘোষিত হলে এটা যেমন সামাজিক মর্যাদাহানি, অন্যদিকে নাগরিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও তিনি পাবেন না। নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এ ছাড়া আইনে আরও অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে।

এ ছাড়া চলতি বছরের জুলাইয়ে স্ত্রী ফেরদৌসী আরা ও ছেলে ফজলুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে আবেদন করেন মিটফোর্ডের মেসার্স আয়েশা এন্টারপ্রাইজের মালিক নজরুল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠানে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র পাইকারি বিক্রি করা হয়। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি থেকে দুই দফায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। পরে ব্যবসায় লোকসান দেখা দেয়।

নজরুলের দাবি, বিভিন্ন মানুষের কাছে তার ব্যবসার ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। কিন্তু সেই টাকা আদায় করতে পারছেন না। ঋণের টাকা আদায়ে ট্রাস্ট ব্যাংক ঢাকার অর্থঋণ আদালত-৬-এ একটি মামলা করেছে। অন্য একটি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

দেউলিয়া মামলায় নজরুল উল্লেখ করেন, তিনি একজন মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। ঋণ পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অবশিষ্ট জীবন ঋণমুক্ত অবস্থায় কাটানোর জন্য তাকে ও পরিবারের সদস্যদের দেউলিয়া ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। এ মামলায় পাওনাদার হিসেবে বিবাদী করা হয়েছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনকে।

আদালত মামলার নথি পর্যালোচনা করে দুই পাওনাদার প্রতিষ্ঠানের হাজিরার জন্য সমন জারি করেন। পাশাপাশি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেন। আগামী ১৫ নভেম্বর সমন বা পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির কপি দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেউলিয়ার মামলা নিয়ে কাজ করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল আমিন কালবেলাকে বলেন, ‘দেউলিয়া আইনের সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ঋণখেলাপিরা। তারা কোটি কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে কেউ বিদেশে পাচার করছেন। কেউ আবার আত্মীয়স্বজন ছাড়াও অন্য মানুষের নামে সম্পদ গড়ছেন। পরে কম সম্পদ দেখিয়ে আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করছেন।

তিনি বলেন, দেউলিয়া ঘোষিত হলে সরাসরি কোনো সাজা হয় না। আবেদনকারী যতটুকু সম্পদ দেখান, সেগুলো বিক্রি করে ব্যাংক বা অন্য পাওনাদারের পুরো অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব না হলেও দেউলিয়া প্রক্রিয়া চলতে পারে। এতে রাষ্ট্রের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে।

তার মতে, দেউলিয়া আদালতে মামলা গ্রহণের আগে আবেদনকারীর প্রকৃত সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করা উচিত। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো কোনো সংস্থার মাধ্যমে সম্পদের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com