

বিশ্বরাজনীতির নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে। তবে এই নির্বাচনের সমীকরণের আড়ালেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে ফের জমতে শুরু করেছে মারাত্মক এক যুদ্ধের মেঘ। ওয়াশিংটন থেকে সামরিক আঘাত নেমে আসতে পারে, এমন আশঙ্কায় নিজেদের পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে তৎপরতা শুরু করেছে তেহরান।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে ইরানের এই বহুমুখী কৌশলের চিত্র। একদিকে সংবেদনশীল ঘাঁটিগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করা, অন্যদিকে পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে মার্কিন হামলা ঠেকানো; জোড়া কৌশলে এগোচ্ছে ইরানি নেতৃত্ব।
ইরানের বার্তা পরিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর ফের হামলা চালায়, তবে সেই যুদ্ধের আগুন শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
পশ্চিমা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিরা সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানি বাহিনী প্রতিবেশী দেশে ঢুকে পড়তে পারে। এমনকি তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং আঞ্চলিক স্পর্শকাতর অবকাঠামো।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা মহসিন রেজায়ি খোলামেলাভাবেই জানিয়েছেন, সংঘাত বাড়লে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডাটা সেন্টার এবং পুরো অঞ্চলের ইন্টারনেট সংযোগকারী সাবমেরিন কেবলে আঘাত হানতে পারে তেহরান। এ ছাড়া সৌদির তেল ক্ষেত্রে আক্রমণের হুমকিও টেবিল থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান বা ক্রুজ মিসাইল ঠেকানোর শতভাগ সক্ষমতা ইরানের নেই। আর তাই এই অসম যুদ্ধ এড়াতে তারা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ধসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে, যাতে ওয়াশিংটন হামলার সিদ্ধান্ত নিতে দুবার ভাবে।
কাগজে-কলমে বা কূটনীতিতেই শুধু হুমকি সীমাবদ্ধ নেই; জল ও আকাশপথেও উত্তাপ বাড়াতে শুরু করেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আচমকা হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে। ওমানের উপকূলে পেট্রো ডলফিন নামক একটি আমিরাতি তেল ট্যাংকারে ড্রোন হামলায় আগুন ধরে যাওয়া এবং ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিশ্ববাণিজ্যকে নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
অন্যদিকে পেন্টাগনও সতর্ক অবস্থানে। ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সম্ভাব্য ড্রোন হামলার হাত থেকে বাঁচাতে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পাঠানো হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর তৃতীয় বিমানবাহী রণপোত এবং নতুন মেরিন কমব্যাট ইউনিট।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের আগে হামলার সম্ভাবনা নাকচ করলেও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো ইরানি পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানার বিষয়টি কৌশলে খোলা রেখেছেন।
বাইরের দেশের জন্য হুমকির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন ধরে রাখাটাই এখন তেহরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, নাতাঞ্জ এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রাচীর বহুগুণ শক্তিশালী করা হয়েছে। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে তৈরি করা হয়েছে বাঙ্কার ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে দেশের নাগরিক সমাজকে যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি দেওয়ার কাজও চলছে জোরকদমে। তেহরানের রাজপথের বড় বড় বিলবোর্ডে সাধারণ নাগরিকদের জন্য কাঁধে রেখে ব্যবহারযোগ্য বিমানবিধ্বংসী মিসাইল ও স্নাইপার রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণের বিজ্ঞাপন ঝুলছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে আইআরজিসির নারী কমান্ডো ইউনিটের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। এমনকি শিশুদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করতে উত্তর-পূর্ব ইরানের কিন্ডারগার্টেনে সেনাদের পাঠানো হচ্ছে আগের যুদ্ধের গল্প শোনাতে।
সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের পারদ কোন দিকে চড়বে তার ওপর। তবে তেহরানের প্রতিটি পদক্ষেপ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, তারা নতি স্বীকার করতে রাজি নয়, বরং সম্ভাব্য যে কোনো লড়াইয়ের জন্য নিজেদের শেষ সীমানা পর্যন্ত প্রস্তুত রাখছে।