বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

ঢাকার বাতাসে বিষ, সংকটে স্বাস্থ্য

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮৬ বার

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের শীর্ষ তালিকায় আবার স্থান করে নিয়েছে রাজধানী ঢাকা। অক্টোবরে একদিনও বায়ুমান ১৫০-এর নিচে নামেনি। অর্থাৎ, মাসজুড়ে ঢাকাবাসী নিঃশ্বাস নিয়েছে বিষাক্ত বাতাসে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচকে রবিবার ১২৭টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা আগামী মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।

ভৌগোলিক কারণে অক্টোবর থেকে বায়ুর মান খারাপ হতে থাকে। এই সময় উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। যে কারণে বিহার, ঝাড়খণ্ড, দিল্লি, পাকিস্তানের লাহোরের দূষিত বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রতিবেশী দেশের বিষাক্ত বায়ু বাংলাদেশের বায়ুর সঙ্গে মিলে বিষে পরিণত হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকার দূষিত বায়ুর ৩০ শতাংশই বাইরের দেশের কারণে ঘটে। বাকি ৭০ শতাংশের অধিকাংশ বায়ুদূষণের জন্য দায়ী ঢাকার চারপাশের শহরগুলো।

বায়ুদূষণের কারণ ও উৎস চিহ্নিত হলেও সংস্থাগুলোর নজরদারির অভাবে বছরের পর বছর দূষণ বেড়েই চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জারি করা নোটিশ মানছে না অন্যান্য সংস্থা। ইটভাটায় এখনও পোড়ানো হচ্ছে গাছ। গাড়ির কালো ধোঁয়া, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আমিনবাজার ল্যান্ডফিল্ড বা বর্জ্যভূমিতে বর্জ্য রাখার জায়গা না থাকায় আশপাশের রাস্তার পাশে পোড়ানো হচ্ছে। ফলে ঢাকার বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ ছাড়া আমিনবাজার, সাভার, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার ইটভাটার দূষিত বায়ুর মিশ্রণে ঢাকার বাতাস আরও দূষিত হচ্ছে।

বায়ুদূষণের জন্য অনেক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা জড়িত থাকলেও নিয়ন্ত্রণে কাগুজে বাঘ পরিবেশ অধিদপ্তর। সরকারি দপ্তরটির বায়ুর মান ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলাদা একটি ভবন থাকলেও দৃশ্যত তেমন কাজ চোখে পড়ে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মাঝেমধ্যে অভিযান আর প্রতিদিনের বায়ুর মান পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি। বায়ুদূষণ রোধে বর্তমান অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। আগের সরকারও এই উদ্যোগ নিয়ে সুফল দেখাতে পারেনি। জানা গেছে, গত ১ জুলাই ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধে একটি সমন্বয় সভা হয়েছিল, সেই সভায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ বা বন্ধে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। ফলে ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধের ঘোষণা মুখে মুখেই রয়ে গেছে।

বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মো. জিয়াউল হক আমাদের সময়কে বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের ৩০ শতাংশ দেশের বাইরের দূষিত বায়ু দ্বারা। বাকি ৭০ শতাংশের মধ্যে বেশিরভাগ ঢাকার আশপাশ থেকে আসা দূষিত বায়ুর কারণে। আমরা দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্মাণ সামগ্রী ঢেকে রাখা এবং খোলা জায়গায় সবুজায়নের পরামর্শ দিয়েছি।

বায়ুদূষণের পরিস্থিতি তুলে ধরে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তের বায়ুর মান জানা যায়। বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা এই লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সেই সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয় ও সতর্ক করে। গতকাল রবিবার সকালে আইকিউএয়ারে ঢাকার গড় বায়ুমান ১৬৩। এই মান অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গতকাল ঢাকার দুয়েকটি জায়গার বায়ুর মান খুব অস্বাস্থ্যকর। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এলাকার বায়ুর মান ছিল ১৭৯। অর্থাৎ, খুব অস্বাস্থ্যকর।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অক্টোবর মাসে দূষণের ঊর্ধ্বগতি ছিল। অক্টোবর মাসের এক দিনও বায়ুর মান ১৫০-এর নিচে রাখা যায়নি। অর্থাৎ, পুরো অক্টোবরে ঢাকাবাসী

এক দিনও ভালো বাতাস নিতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দপ্তর বা সংস্থার টেকসই উদ্যোগ নেই। এবার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহনের আধিক্য। এ বছর ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে জোরালো কোনো অভিযান ছিল না। ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় রেখে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।

ঢাকার কয়েকটি জায়গার বায়ুর মান বেশি খারাপ। এসব এলাকার মধ্যে শীর্ষে ছিল মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং, স্কোর ২০১। এই মানকে খুব অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচনা করা হয়। বাকি ছয় এলাকা হলো দক্ষিণ পল্লবী (১৯২), কল্যাণপুর (১৮৩), পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি (১৭৭), গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (১৬৩), শান্তা ফোরাম (১৬২), বে’জ এজ ওয়াটার (১৬০) ও গোড়ান (১৫৭)।

সিঙ্গাপুরের নানিয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনটিইউ) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ুদূষণের কারণে ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক গত বছরের মার্চে ‘দ্য বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালিসিস (সিইএ)’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়Ñ বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণসহ চার ধরনের পরিবেশদূষণে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। এ ছাড়া দূষণের কারণে ওই বছর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

গাড়িতে পোড়া জ্বালানি, ইটভাটা, নির্মাণ সামগ্রী, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক জ্যাম, বর্জ্য পোড়ানো, রান্নায় লাকড়ি পোড়ানো, কলকারখানার পোড়ানো জ্বালানি, এসি থেকে নির্গত দূষণ, ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতিসহ নানা উৎস থেকে বায়ুদূষণ হয়।

বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, অ্যাজমাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুর জন্য সবচেয়ে বড় বাহ্যিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের আয়ু গড়ে সাড়ে ৫ বছর কমছে। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সে (একিউএলআই) ২০২৫ সালের হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ।

বায়ুদূষণের প্রভাব সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, পৃথিবীতে হৃদরোগে যত লোক মারা যায়, তার ২৫ শতাংশ মৃত্যু হয় বায়ুদূষণের কারণে। বর্তমানে বাংলাদেশে শ্বাসতন্ত্রী ও এলার্জিজনিত সমস্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। দূষিত বায়ু শিশুদের বর্ধন বা বৃদ্ধিতেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ রোধে এখনই ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক খাতে মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এ জন্য সবগুলো সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com