

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে একই দিনে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় অবস্থানে বিএনপি। দলটি মনে করে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফেরানোর স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারও একই অবস্থানে থাকবে। তাই নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠানের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করে যাবে বিএনপি। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের বিষয়ে সমঝোতার জন্য আলোচনায় বসতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আটটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে আন্দোলন করছে। তারা গত বৃহস্পতিবার কর্মসূচি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়েছে। এ ছাড়া সরকারের দিক থেকেও রাজনৈতিকগুলোকে একসঙ্গে বসার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে দ্রুত সব দলের অভিন্ন মত চায় সরকার।
এই বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরপর গতকাল শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণভোট হলে নির্বাচনের দিনই হতে হবে। নির্বাচন (সরকার ঘোষিত) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই হতে হবে। অন্যথায়, বাংলাদেশের মানুষ কিছু মেনে নেবে না। আমরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে বিএনপি যে কোনো মূল্যে নির্বাচন চায়। এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চায় দলটি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এমনটা চান। সে অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে যাতে কোনো ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়, এমন কিছু করবে না দলটি। এর অংশ হিসেবে শালীনতা বজায় রেখে সরকার সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের এই নির্দেশনা জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। যদিও শুরু থেকেই সরকারকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে আসছে বিএনপি।
এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জামায়াতে ইসলামীর আলোচনায় বসার আহ্বানকে ‘সঠিক পন্থা’ বলে মনে করছে না
বিএনপি। দলটির অভিমত, সমস্যার সৃষ্টি করেছে সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন মিলে। কারণ সনদ বাস্তবায়নে কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে দলগুলোর ঐকমত্যে স্বাক্ষরিত সনদের মিল নেই। সনদে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট (দ্বিমত)’ লিপিবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা রাখা হয়নি। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার প্রস্তাবকে এক ধরনের তামাশা মনে করছে বিএনপি।
দলটির অবস্থান হচ্ছে, এটা নিয়ে আলোচনার জন্য সরকার দলগুলোকে ডাকতে পারে এবং ডাকলে তাতে সাড়া দিয়ে বিএনপি তাদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরবে। ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ ঐকমত্য হওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের আইনানুগ বাস্তবায়ন চায় বিএনপি। একই সঙ্গে যথাসময়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানও চায়। এ লক্ষ্যে আন্তরিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলো গত ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদ থেকে যায়। এমন অবস্থায় ২৮ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন গণভোট করাসহ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায়-সম্পর্কিত সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে জাতীয় নির্বাচনের দিনেই একসঙ্গে গণভোট আয়োজনের দাবিতে অটল থাকে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট চায়। এ দাবিতে দলগুলো কর্মসূচি নিয়ে মাঠেও নামে।
বিএনপি ও জামায়াতের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে বিএনপি, জামায়াতসহ দলগুলোর মধ্যে যে রাজনৈতিক অনৈক্য তৈরি হয়েছে, তা দূর করে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে সুপারিশ দেওয়ার আহ্বান জানায় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময়ের মধ্যে দলগুলো নিজেরা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করে একমত হবে বলে মনে করছে সরকার। তবে এ সময়ের মধ্যে দলগুলো একমত হতে না পারলে সরকার তার নিজের মতো করেই কাজ করবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।
এমন অবস্থায় সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট প্রশ্নে উদ্ভূত সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে যাতে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়, সে জন্য গত বুধবার এক বৈঠক থেকে উদ্যোগী হয় গণতন্ত্র মঞ্চ, এনসিপিসহ ৯ দল। এর পরদিনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনার আহ্বান জানান জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। বিএনপি মহাসচিব তখন দলের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করে জানানোর কথা বলেন।
জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। নেতারা অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, জামায়াত তো সরকার না। ফলে রাষ্ট্রীয় কোনো বিষয়ে তারা আমাদেরকে ডাকতে পারে না। ব্যক্তিগত কোনো দাওয়াতে ডাকতে পারে কিংবা দুই দলের মধ্যকার কোনো বিষয় হলে সেক্ষেত্রেও ডাকতে পারে। সুতরাং সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট প্রশ্নে সৃষ্ট সংকট নিরসনে জামায়াতের আহ্বানকে ‘সঠিক পন্থা’ বলে মনে করছে না বিএনপি। তাই জামায়াতের আলোচনার আহ্বানে তারা সাড়া দেবে না।
এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং ওই আদেশের ওপর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করাসহ পাঁচ দফা দাবি আগামী ১১ নভেম্বরের মধ্যে সরকারকে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় ১১ নভেম্বর আটটি রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে রাজধানীতে মহাসমাবেশ হবে। সেদিন ঢাকার চিত্র ভিন্ন হবে।
জামায়াতসহ আটটি দলের এমন আল্টিমেটাম নিয়েও বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। দলটির নেতারা এটিকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন বানচাল বা পেছানোর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। বিএনপি দৃঢ়ভাবে মনে করে যে, দীর্ঘ আলোচনায় উপনীত ঐকমত্যকে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং কোনোমতেই নিত্য-নতুন প্রশ্ন উত্থাপন কিংবা সংকট সৃষ্ট করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি করবে না। নির্বাচন বাধাগ্রস্ত বা বানচাল হলে পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে দলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ ও বিস্তারিত আলোচনা শেষে কতিপয় বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ যে সব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঐতিহাসিক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়েছে, আমরা তার অংশীদার হিসেবে সনদে বর্ণিত সব বিষয়কে ধারণ করি এবং দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জুলাই জাতীয় সনদের যে সব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে তার আইনানুগ বাস্তবায়নের জন্য এবং যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আন্তরিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায়।