

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে দিয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করান তখনকার সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদসহ তার অনুগত সেনা কর্মকর্তারা। এর আগে বিরোধীদল আওয়ামী লীগসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর টালমাটাল আন্দোলনের মধ্যে মইন উ আহমেদ সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গভবনের সতর্কতা এবং কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্র সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এমনকি তখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার কড়া ভাষায় হুমকি দিয়েছিল সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলে তারা মেনে নেবে না। এরপরই সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা থেকে মইন উ আহমেদ এবং তার অনুগত সেনা কর্মকর্তারা সরে এসে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পথে হাঁটেন। রাজধানীর পল্টন থানার একটি মামলায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছয় দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, বিরোধীপক্ষের রাজপথের টালমাটাল আন্দোলনের মধ্যেই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি মইন উ আহমেদ তিন বাহিনী প্রধানকে নিয়ে যান বঙ্গভবনে। তার লক্ষ্য ছিল উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি যেন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। সে অনুযায়ী তারা গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য করেন। রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করতে জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দেবেন সেটিও লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন সেনাপ্রধান। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করতে রাজি হচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে সেনাপ্রধানের ফোন পেয়ে শেষ বিকেলে তিনি বঙ্গভবনে যান। গিয়ে দেখতে পান সেখানে সেনাপ্রধান, তিন বাহিনী প্রধান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার ফজলুল বারী চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। এক পর্যায়ে ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে রাজি হন। এরপরই সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করেন।
২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আগে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ছিলেন এম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। পরবর্তীকালে তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি পর্যন্ত বঙ্গভবনের অন্দর মহলের অধিকাংশ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মোখলেসুর রহমান। গতকাল বুধবার তিনি টেলিফোনে আমাদের সময়কে বলেন, ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারির আগে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন। এ জন্য নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিনকে পর্দার আড়ালে নিয়োগ করেছিলেন। এ খবর বঙ্গভবনে আসলে পাল্টা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এ নিয়ে কথা বলেন কয়েকটি দেশের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় তারা সামরিক শাসনের বিরোধী। ফলে শেষ পর্যন্ত মইন উ আহমেদ সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পথে আর হাঁটেননি।
তিনি আরও বলেন, সরকারবিরোধী তুমুল আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি মনে করেছিল মইন উ আহমেদ তাদের লোক। তাদের সঙ্গেই আছেন। অনেক পরে বিএনপির সেই ভুল ভাঙে। মইন উ আহমেদ আসলে পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন। ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করার জন্য জেনারেল মইন ভাষণ লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সেই ভাষণ বিটিভিতে প্রচারের জন্য রেকর্ড করার আগে তিনি কয়েকটি লাইন কেটে দিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেনারেল মইন উ আহমেদ উচ্চাখিভলাসী হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের সরকারবিরোধী আন্দোলনের মোড়কে জেনারেল মইন পর্দার আড়ালে ক্ষমতা গ্রহণের নীলনকশা করতে থাকেন। তারই অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের সরকারবিরোধী আন্দোলনে গোপনে ইন্ধন দেন। চার দলীয় জোট সরকার তখন ক্ষমতায় নেই। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বঙ্গভবন। তখন গোয়েন্দা মারফত বঙ্গভবনে খবর আসে মইন উ আহমেদ ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করছেন। এ তথ্য পেয়ে বঙ্গভবনের কর্তা ব্যক্তিরা সতর্ক হয়ে যান। জেনারেল মইনের সামরিক শাসন ঠেকাতে তখন রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তৎকালীন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস, জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানসহ কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানানো হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে মইন উ আহমেদকে জানিয়ে দেওয়া হয় সামিরক শাসন জারির পক্ষে নয় তারা। দেশ দুটির পক্ষ থেকে পরোক্ষভাবে মইন উ আহমেদকে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। ফলে সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নকশা থেকে সরে আসেন জেনারেল মইন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, মইন উ আহমদ ২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারির মধ্যে সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন। এ বিষয়টি কাউন্টার গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে বঙ্গভবন জেনে যায়। যেকারণে ৭ এবং ৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত মইন উ আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সতর্ক করা হয়েছিল। তারা বলেছিলেন, সামরিক আইন জারি হলে আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ করা হবে। এ ছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। এরপরই মইন উ আহমেদ প্ল্যান বি’তে ধাবিত হয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারির পথে হাঁটেন।
মইন উ আহমেদের লেখা ‘শান্তির স্বপ্নে’ নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন, তিনিসহ সশস্ত্র বাহিনীর অন্যান্য প্রধান ও ডিজিএফআইয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্তা সেদিন (২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি) প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। তারা আড়াইটার সময় বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। ভেতরে গিয়ে শোনেন, প্রেসিডেন্ট মধ্যাহ্নভোজ করছেন। তাদের একটি কামরায় অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পর প্রেসিডেন্টের দেখা মেলে। প্রেসিডেন্টকে তারা ‘মহা-সংকময় পরিস্থিতি’ থেকে দেশকে উদ্ধার করার অনুরোধ জানান। প্রেসিডেন্ট বিষয়টি ভেবে দেখার সময় নেন।
জেনারেল মইন তার বইতে লিখেছেন, ‘আমি জানতাম ইতঃপূর্বে উপদেষ্টা পরিষদের অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অজানা কোনো কারণে ও প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। যার কারণে আমরা কোনো দুষ্টচক্রকে আবার নতুন কোনো খেলা শুরু করার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম না। কক্ষে নেমে এলো সুনসান নীরবতা… আমার মনে হলো আমাদের চোখ দিয়ে পুরো দেশ যেন তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্টের দিকে’। দীর্ঘ নীরবতার পর প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে মত দেন। সেই সঙ্গে তিনি নিজে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দেবেন বলে জানান। বইতে দু’ঘণ্টার মতো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বইতে তিনি উল্লেখ করেন, ওইদিন বঙ্গভবন থেকে আর জীবিত ফিরে নাও আসতে পারেন বলে ধারণা করেছিলেন। তিনি এমন কিছু প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছিলেন, যার কারণে তৎক্ষণাৎ প্রেসিডেন্ট তাদের বরখাস্ত করতে পারেন, গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন, এমনকি হত্যার নির্দেশও দিতে পারেন। বঙ্গভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্ভেদ্য উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘…তারা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হলেও তাদের কর্মপদ্ধতি ভিন্ন। বঙ্গভবনে তাদের কাছে প্রেসিডেন্টই একমাত্র ভিভিআইপি যাকে রক্ষা করতে তারা নিয়োজিত’। ‘এমনকি প্রেসিডেন্টের জীবনের ওপর হুমকি মনে করলে তারা যে কাউকে হত্যা করতে পারেন। পিজিআর কিংবা এসএসএফ, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য কোনো বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের আওতাধীন নয়। এমন নিরাপত্তা বলয়ে আমরা কজন যাচ্ছি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায়।’ বঙ্গভবনে রওনা হওয়ার আগে মেজর জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি না ফিরলে পরবর্তী পরিস্থিতি সিজিএস হিসেবে প্রাথমিকভাবে তাকেই সামাল দিতে হবে।’