শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন

চাকরি আইনের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ হবে আইজিপি নিয়োগ হচ্ছে পুলিশ কমিশন

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৩ বার

পুলিশকে রাজনৈতিক ‘হস্তক্ষেপমুক্ত ও জনবান্ধব’ করতে কমিশন করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ কমিশনের অধীনেই চলবে পুলিশের সব কার্যক্রম। এজন্য পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ চূড়ান্ত করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বয়স যতই হোক না কেন, মহা-পুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) পদে নিয়োগের তারিখ থেকে দুই বছর চাকরিতে থাকবেন। আইজিপি নিয়োগের এমন বিধান সরকারি চাকরি আইনের দ্বাদশ অধ্যায়ের ৪৩ ধারার সঙ্গে সরাসরি ‘সাংঘর্ষিক’। প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনের চেয়ারপারসনসহ শীর্ষ তিন পদেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে পুলিশের ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিচারকদের কবজায় চলে যাবে বলে মনে করছেন প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

প্রশাসন বিশ্লেষক মো. ফিরোজ মিয়া কালবেলাকে বলেন, আইজিপি নিয়োগের বিধানটি সরাসরি সরকারি চাকরি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ পুলিশ এ আইনের অধীনেই চাকরি করে। সুতরাং ৫৯ বছরের বেশি চাকরি করার তাদের এখতিয়ার নেই। এ নিয়ম ভবিষ্যতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিবসহ অন্যান্য সচিব কিংবা সংস্থা প্রধানদের খেপিয়ে তুলতে পারে। তারাও এমন বিধান চাইবে যেন তারা সচিব পদে কমপক্ষে দুই বছর কিংবা ৫৯ বছরের বেশি সময় চাকরি করতে পারেন। ফলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

অন্যদিকে, এ কমিশনের চেয়ারপারসনসহ গুরুত্বপূর্ণ যেসব পদে বিচারকদের নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও যৌক্তিক কথা নয়। প্রশ্ন রেখে ফিরোজ মিয়া বলেন, বিচারপতিরা কি পুলিশ বিষয়ে অভিজ্ঞ? কেন তাদের নিয়োগ দিতে হবে? বরং যারা প্রশাসনিকভাবে দক্ষ এবং পুলিশ বিষয়ে অভিজ্ঞ, তাদের কমিশনে দায়িত্ব দিতে হবে। প্রশাসন কিংবা পুলিশ ক্যাডারের লোকজনই পুলিশ কমিশনে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের প্রশাসনিক আইনকানুন নিয়ে বহু গ্রন্থ লিখেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া।

অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারি চাকরি আইনে কর্মচারীদের অবসরের সময়সীমা ৫৯ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীর ক্ষেত্রে ৬০ বছর। পুলিশও এ আইনের অধীনে চাকরি করে। কিন্তু পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ার অল্প সময় আগে কেউ আইজিপি পদে নিয়োগ পেলে তিনি ৬১ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরির সুযোগ পাবেন। ফলে তিনি অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীর চেয়ে বেশি সময় চাকরিতে থাকার সুবিধা পাবেন। আবার অনেকে খুব কম বয়সে চাকরিতে প্রবেশ করে তাড়াতাড়ি পদোন্নতি পেয়ে আইজিপি হওয়ার পর মাত্র দুই বছর চাকরি করে অবসরে যাবেন। হয়তো তিনি ৫৯ বছর পূর্ণ করার সুযোগও পাবেন না। সুতরাং উভয় নিয়োগের ক্ষেত্রেই বৈষম্য সৃষ্টি হবে।

এ ছাড়া আইজিপি নিয়োগের এমন বিধান চালু হলে সরকারের অন্যান্য সচিব কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। সুতরাং এ অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা কিংবা অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য সরকারি চাকরি আইনের পরিপন্থি ধারাটি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে যুক্ত করা মোটেই সমীচীন হবে না বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

শীর্ষ তিন পদেই বিচারপতি:

অধ্যাদেশের খসড়ায় দেখা গেছে, কমিশনের চেয়ারপারসনসহ গুরুত্বপূর্ণ তিন পদে বিচারপতিদের নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। চেয়ারপারসন ছাড়া বাছাই কমিটি এবং পুলিশের প্রতিটি বিভাগের জন্য গঠিত ‘পুলিশ জবাবদিহিতা ইউনিটের’ প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাবেন বিচারকরা। অর্থাৎ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সবচেয়ে বড় বাহিনী পুলিশের নিয়ন্ত্রণ করবে বিচার বিভাগের লোকজন। এটি পুলিশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, খুব সূক্ষ্ম বুদ্ধির খেলায় পুলিশের নিয়ন্ত্রণ বিচার বিভাগের লোকজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা। কেন তাদের বেসামরিক প্রশাসনের দিকে টেনে আনা হচ্ছে? এ অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের কাছে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার পেছনে একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্মকর্তারা জানান, কমিশনে প্রস্তাবিত ‘পুলিশ জবাবদিহিতা ইউনিট’ প্রশাসন ক্যাডার ও পুলিশ ক্যাডারের সমন্বয়ে গঠন করা দরকার। কারণ পুলিশ নিয়ে এ দুই ক্যাডারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখানে বিচারপতিদের টেনে আনার কোনো দরকার পড়ে না।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় আপত্তি :

গত ৬ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া নিয়ে কর্মকর্তারা তাদের আপত্তি তুলেছেন। বৈঠকসূত্র কালবেলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র জানায়, সভায় বলা হয়েছে পুলিশকে স্বাধীন করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত অন্যায়-অপরাধের জন্য বেসামরিক প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলকে জবাবদিহি করতে হয়। কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে পুলিশ নিজেদের মতোই সব সিদ্ধান্ত নেবে। জনস্বার্থে সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য কিংবা অন্য রাজনৈতিকরা অনেক সময় পুলিশকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে। কমিশন গঠনের পর পুলিশ সেসব দিকনির্দেশনা মানবে কি না, তারা বেপরোয়া হয়ে পড়ে কি না, তা অধ্যাদেশ জারির আগেই বিবেচনায় নিতে হবে।

সভায় একজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের জন্য গঠিত কমিশনে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে এমন লোকদের নিয়োগের বিধান রাখা উচিত। কিন্তু এ কমিশনের চেয়ারপারসনসহ বেশ কয়েকটি পদে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। এতে করে এ কমিশনের প্রতি পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তাদের আস্থা থাকবে কি না, তা ভেবে দেখা উচিত। বর্তমানে পুলিশের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারের আমলারা। এ নিয়েও পুলিশে ক্ষোভ আছে। ভবিষ্যতে কমিশনের মাধ্যমে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ বিচারপতিদের হাতে গেলে নতুন করে আবারও ক্ষোভ দেখা দিতে পারে। পুলিশের দেখভাল-প্রশাসনিকভাবে দক্ষ ও পুলিশ বিষয়ে অভিজ্ঞদের হাতে থাকাই উত্তম। খসড়ার নানা ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলো সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৈঠকসূত্র কালবেলাকে এমন তথ্য জানিয়েছে।

কমিশন গঠনের রূপরেখা :

অধ্যাদেশে কমিশন গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক কমিশনের চেয়ারপারসন হবেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ থাকবেন। সরকারের জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড-২ পদমর্যাদার নিম্নে নন, এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার নিম্নে নন, এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কমিশনের সদস্য সচিব হবেন। বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অথবা বাংলাদেশ পুলিশ স্টাফ কলেজের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। আইন, অপরাধ-বিজ্ঞান বা পুলিশ বিজ্ঞান বিষয়ের একজন কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং মানবাধিকার উন্নয়ন বা বাস্তবায়নে কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মানবাধিকারকর্মী কমিশনে সদস্য হবেন। কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে দুজন নারী হবেন।

কমিশনের চেয়ারপারসন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক এবং সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিচারের বিচারকের সমমর্যাদাভুক্ত হবেন। চেয়ারপারসনের পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে শূন্য পদে নবনিযুক্ত চেয়ারপারসন তার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত কিংবা চেয়ারপারসন ফের স্বীয় দায়িত্ব পালনে সমর্থ না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের বায়োজ্যেষ্ঠ সদস্য চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করবেন।

অন্যদিকে কমিশন পুলিশের প্রতিটি বিভাগে সার্বক্ষণিক তিন সদস্যের সমন্বয়ে একটি পুলিশ জবাবদিহি ইউনিট গঠন করবে। একজন জেলা জজ ইউনিটের চেয়ারপারসন হবেন। অর্থাৎ, এখানেও বিচারকদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, পুলিশের সব নিয়ন্ত্রণ বিচারপতিদের ঘাড়ে ছেড়ে দেওয়া সমীচীন হচ্ছে না। কমিশনে পুলিশ বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com