

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর দুদিনের মধ্যেই প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজধানীর ঢাকা-১১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এমএ কাইয়ুমের মধ্যে শুরু থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছে।
শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, তার নির্বাচনী প্রচারে কর্মীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে, ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এমএ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে পোস্টার সাঁটানোর অভিযোগ তোলেন নাহিদ ইসলাম। এ ছাড়া কাইয়ুমের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এমএ কাইয়ুম পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে কেউ কেউ রাজনীতি ও ব্যবসা করছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই শহীদদের পরিবার আমাদের পরিবারেরই অংশ। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের সঙ্গে নিয়েই ঢাকা-১১ আসনকে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত করব।’ বিএনপি ক্ষমতায় এলে শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
প্রায় সাড়ে চার লাখ ভোটার নিয়ে গঠিত ঢাকা-১১ আসনটি রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিলের কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত। এ আসনে মোট নয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটারদের মতে মূল লড়াই হবে বিএনপির এমএ কাইয়ুম এবং এনসিপির নাহিদ ইসলামের মধ্যে। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন- বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ (ছড়ি), গণফোরামের মো. আব্দুল কাদের (উদীয়মান সূর্য), গণঅধিকার পরিষদের মো. আরিফুর রহমান (ট্রাক), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. জাকির হোসেন (হাতি), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মিজানুর রহমান (আম), জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ (লাঙ্গল) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (হাতপাখা)।
গতকাল শনিবার ভাটারা এলাকায় গণসংযোগে অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, একটি দল নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ভোট কেনার কৌশল নিচ্ছে এবং বাস্তবায়ন অযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। তিনি ভোটারদের এসব আশ্বাসে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা হচ্ছে উল্লেখ করে সবাইকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কর্মীদের কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিভিন্ন সভায় তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় এলে অসচ্ছল পরিবারগুলোকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে।
এদিকে এমএ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভেঙে বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডার অলিগলিতে তার পোস্টার সাঁটানো রয়েছে। এ বিষয়ে বিরোধীপক্ষ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছে বলে জানা গেছে।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই দুই প্রধান প্রার্থী ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইছেন। শুক্রবার নাহিদ ইসলামের সমর্থকরা ব্যাপক শোডাউন করেন। অন্যদিকে কাইয়ুমের সমর্থকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধানের শীষে ভোট চাচ্ছেন। পথসভা, উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে চলছে গণসংযোগ।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ ইসলাম রামপুরার বনশ্রীর বাসিন্দা এবং এই এলাকা আন্দোলনের সময় বেশ সরব ছিল। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা এমএ কাইয়ুমও এলাকায় জনপ্রিয়। দুই পক্ষই নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
রামপুরার বাসিন্দা শামসুল হুদা বলেন, ‘যিনি এলাকার উন্নয়নে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারবেন, ভোটাররা তাকেই বেছে নেবে।’ বাড্ডার বাসিন্দা আরিফুর রহমান মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের কারণে নাহিদ ইসলামের প্রতি ভোটারদের একটি অংশ আশাবাদী। আবার হাতিরঝিল এলাকার এমএ কালাম জীবন বলেন, ‘এমএ কাইয়ুম একজন অভিজ্ঞ ও নির্যাতিত নেতা। তার ওপর ভোটারদের আস্থা রয়েছে।’
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে এমএ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব গ্রহণ ও সেখানে সম্পত্তি থাকার অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে। এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাইয়ুমের দাবি, রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর থেকে রিফিউজি কার্ড পেয়েছিলেন এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে সেই কার্ডের কারণেই তাকে ডিপোর্ট করা হয়নি। বিষয়টি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঢাকা-১১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন।