বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:০৬ অপরাহ্ন

নির্বাচন ‘বানচালে’ কারাগারে বসেই আ.লীগ নেতাকর্মীদের ‘গোপন মেসেজ’!

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার

ভয়ঙ্কর বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। টাকার বিনিময়ে বন্দিদের স্বাভাবিক অধিকার বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিলেই বন্দীরা পাচ্ছেন ভাল সিট ও মেডিকেলে থাকার সুযোগ। কারা অভ্যন্তরে অবাধে ঢুকছে মাদক ও মোবাইল ফোন। এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘বানচালে’ কারাবন্দী সাবেক সংসদ সদস্যরা তাদের নেতাকর্মীদের ‘গোপন মেসেজ’ দিচ্ছেন বলে সরকারি সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে।

অভিযোগ উঠেছে, কিছু কারারক্ষী জুতার ভেতরে লুকিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ছাড়াও অবস্থা সম্পন্ন বন্দিদের কাছে ছোট আকারের মোবাইল ফোন সরবরাহ করছেন। এছাড়া মোটা অংকের বিনিময়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং রাজনৈতিক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের ‘মুক্তি বাণিজ্য’ চলছে। কারাগারের কিছু কর্মকর্তার পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকজন  কারাপরিদর্শক এসব অনিয়মে জড়িত বলে ওই সংস্থাটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সূত্রটি জানায়, গভীর রাতে টয়লেটে গিয়ে স্বজন ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন কারাবন্দি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা। ওয়ার্ডে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের মেনেজ করে প্রতিদিন নিয়ম করে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন তারা। পলিথিনে মুড়িয়ে এবং একটি সুতার সাহায্যে মোবাইল ফোন লুকিয়ে রাখা হচ্ছে টয়লেটের কমোডের ভেতর। সুবিধামতো সময়ে কমোড থেকে তোলা হয় পলিথিন মোড়ানো সেই মোবাইল ফোনটি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘বানচালে’ কারাবন্দী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা মোবাইল ফোনে ‘গোপন মেসেজ’ দেওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘কারাগার নিয়ে এসব চোখ বন্ধ করা অভিযোগ। কারাগার ভিত্তিক অনিয়ম, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। এই কারাগারে ২০০ ওয়ার্ড আছে। জনবল কম। ম্যান টু ম্যান নজরদারি করা সম্ভব নয়।’

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে বর্তমানে যারা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী আছেন তারা হলেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফ, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন নদভী এবং চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৪-৫ গুণ বেড়ে গেছে। এ সুযোগে বিভিন্নস্তরের কারারক্ষী ও কারা কর্মকর্তারা বন্দি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। কারাগারে সিট বাণিজ্য করে প্রতিমাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করে এক কারা কর্মকর্তা জানান, বন্দি বেড়ে গেলে বিত্তবানরা টাকা দিয়ে আরাম-আয়েশে থাকার চেষ্টা করেন। টাকা নিয়ে সুযোগ-সুবিধা দেন কিছু কারারক্ষী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে মাদকদ্রব্য সরবরাহ এবং মোবাইল ফোন সেট বিক্রি। অতিরিক্ত দামে কেনা ছোট আকৃতির ফোন নিজেদের কাছে কৌশলে লুকিয়ে রাখেন কয়েদিরা। অভিযোগ আছে, গভীর রাতে ফটকে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের মেনেজ করে রাজনৈতিক নেতা বা ভিআইপি বন্দিদের জন্য বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে চাহিদামতো টাকা না পেলে বন্দির ওপর নেমে আসে নির্যাতন। দরজা বা টয়লেটের পাশে বিছানা পেতে তাকে রাত যাপন করতে বাধ্য করেন ওয়ার্ডের দায়িত্বরত কারারক্ষীরা। এসবের পাশাপাশি চলছে রাজনৈতিক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে জেল গেটে ‘মুক্তি বাণিজ্য’। নতুন মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে কারাগারের একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা-পয়সা। এসব অনিয়মে জেলার, ডেপুটি জেলার, কারারক্ষী ও খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী কিছু ঠিকাদার জড়িত বলে  জানিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্রটি জানায়, মাছ-মাংস ও সবজি বোঝাই গাড়ির মধ্যে লুকিয়ে কারা অভ্যন্তরে মোবাইল ফোন ঢোকানো হচ্ছে। মোবাইল ব্যবহার করে বন্দিরা কারাগার থেকে বাইরে চাঁদাবাজি, খুনের হুমকিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, জেলার  সৈয়দ শাহ শরীফের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে চলছে দুর্নীতির এই মহোৎসব। টাকার বিনিময়ে ডান্ডাবেড়ি  থেকে মুক্তি, কারা হাসপাতালকে বিলাসবহুল বিশ্রামাগারে পরিণত করার মতো ঘটনা ঘটছে এই কারাগারে। অভিযোগ, কারা হাসপাতালে অসুস্থ বন্দিরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। কারা হাসপাতাল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক নেতা ও বিত্তশালী বন্দিদের জন্য ‘বিশেষ বিশ্রামাগার’। এখানে সিট পেতে বিনিময় হচ্ছে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতিমাসে সংশ্লিষ্ট বন্দিরা কারা কর্মকর্তাদের দিচ্ছেন ১০-১৫ হাজার টাকা।

জানা গেছে, কারা হাসপাতালে বর্তমানে ১৫-২০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা টাকার বিনিময়ে সেখানে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন।

অভিযোগ আছে, সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ যুবলীগ-ছাত্রলীগের বড় ও মাঝারি পর্যায়ের অন্তত ৮ জন নেতা প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে কারা হাসপাতালে থাকছেন। চিকিৎসার নামে মোটা অংকের টাকা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১২ নম্বর হৃদরোগ ওয়ার্ডে ‘চিকিৎসা’ নিচ্ছেন কারাবন্দী চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল জাব্বার।

কারা সূত্র জানায়, সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান হত্যা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ৪০ মামলার আসামি চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইসমাঈল হোসেন ওরফে টেম্পু। নির্বাচনী মাঠে ব্যবহারের জন্য নতুন কোনো মামলায় যাতে টেম্পুকে গ্রেপ্তার করা না হয় সেজন্য ‘আ’ আধ্যাক্ষের এক বেসরকারি কারাপরিদর্শক পুলিশের কাছে তদবির করেন। কিন্তু তার তদবির ধোপে টেকেনি। নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় টেম্পুকে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী প্রধান কারারক্ষী ছিলেন তারিকুল ইসলাম শাহীন। বন্দিদের কাছে মাদক সরবরাহের অভিযোগে ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর তিনি চাকরি হারান। কারা অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন কারাগারে টাকার বিনিময়ে বন্দিদের কাছে মাদকদ্রব্য, মোবাইল ফোন সরবরাহসহ বিভিন্ন অভিযোগে এই পর্যন্ত অন্তত ৫১ কারারক্ষী শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন ছয়জন।

কারা অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের অধীন ১১ কারাগারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধে জড়িত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার, কক্সবাজার জেলা কারাগার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার ও  নোয়াখালী জেলা কারাগারের কারারক্ষীরা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com