

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক বাতিলের খবর অনেকের কাছে স্বস্তির হলেও এ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তাতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। তবে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অবশ্য এই শুল্ক এখনও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তিতে নির্ধারিত ১৯ শতাংশের চেয়ে কম।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যেমন নতুন করে কী ধরনের শুল্ক আসতে পারে, বাতিল হওয়া শুল্কের অর্থ ফেরত দিতে হবে কিনা, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বিভিন্ন দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনাÑ এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই।
তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, শুল্ক কমায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ঘন ঘন শুল্কহার পরিবর্তনের কারণে সর্ববৃহৎ রপ্তানি বাজারটি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রায়ের পর ট্রাম্প সব দেশের ওপর প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরে সেটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এই শুল্ক কার্যকর হলে
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা গত বছরের এপ্রিলের আগে যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ঘন ঘন শুল্ক পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। কখন শুল্কহার কত হবে, তা জানা না থাকায় আমদানিকারকরা আমদানির ঝুঁকি নিতে চান না। তবে খুচরা বিক্রেতরা তাদের শেল্ফগুলো খালি রাখবে না। তারা কম পরিমাণে আমদানি করবে। এতে রপ্তানি কমতেও পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, শুল্ক কমায় যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা আগের চেয়ে কম খরচে পোশাক আমদানি করতে পারবেন। এতে দেশটির খুচরা বাজারে তৈরি পোশাকের দাম কমবে। ফলে ভোক্তারা আগের চেয়ে বেশি পোশাক কিনতে পারবেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তারা এ আশঙ্কাও করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেও এটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ অনুমান করতে পারছেন না। এ কারণে ক্রেতারা বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার এড়িয়ে ঝুঁকি কমাতে ছোট চালান বেছে নিতে পারেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। দুই দেশের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি, আমদানি কম।
পাল্টা শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতির এই বিষয়টিকে বড় করে সামনে এনেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, কৃষিপণ্যসহ নানা পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আগমুহূর্তে যে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়েছে, সেটি নিয়ে খুশি হতে পারেননি বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ কিংবা ব্যবসায়ীদের কেউই। তাদের মতে, ওই চুক্তিতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকা বেশি লাভবান হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ কী করতে পারবে, কী পারবে নাÑ এ বিষয়গুলোই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাদের সময়কে বলেন, এই মুহূর্তে সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে চুপ থেকে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কারণ সময়ে সময়ে তিনি (ট্রাম্প) নীতি পরিবর্তন করছে। এতে সারা বিশ্বের আমদানি-রপ্তানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বায়াররাও বেকায়দায়। তারা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। আর ক্রেতারাও কনজিউম (ভোগ) কমিয়েছে। দুই দিন পরপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সব দেশের রপ্তানি কমেছে। ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টাবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এ জন্য আমাদের এখন পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পুরনো চুক্তি নিয়ে এখন আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে সময় নেওয়া। এ নিয়ে আলোচনার সময় এখনও আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের রায় আমাদের জন্য একটা সুখবর। তবে আলোচনার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা হচ্ছে। বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আজ বা আগামীকালের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।