সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৫ অপরাহ্ন

আলোচিত-সমালোচিত চার চরিত্র

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি এখন আর কেবল কূটনীতির টেবিলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আবর্তিত হচ্ছে চারজন প্রবল প্রতাপশালী ব্যক্তিত্বের খেয়ালখুশির ওপর। হোয়াইট হাউস থেকে ক্রেমলিন, বেইজিং থেকে পিয়ংইং- এই চার প্রান্তের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ মানচিত্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ¬াদিমির পুতিন, শি জিনপিং এবং কিম জং উন- এই চার নেতা কেবল তাদের দেশের শাসক নন, বরং তারা বর্তমান বিশ্বের এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি। আমাদের আজকের আয়োজন এই চার নেতার বর্তমান হালহকিকত নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন- আজহারুল ইসলাম অভি

বর্তমান জনপ্রিয়তা

ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্র

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা একটি স্থির কিন্তু বিভক্ত অবস্থায় আছে। তার সমর্থকগোষ্ঠী বা বেজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন মূলত জো বাইডেন প্রশাসনের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা (মূল্যস্ফীতি) এবং অভিবাসননীতির বিরোধিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ ও কর্মজীবী শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হলেও শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনও তার ঘোরবিরোধী। অর্থাৎ, তিনি দেশের অর্ধেক মানুষের কাছে অপ্রতিরোধ্য নায়ক আর বাকি অর্ধেকের কাছে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।

ভ্লাদিমির পুতিন, রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তা এখনও ঈর্ষণীয় পর্যায়ে (সরকারি হিসাবে ৮০%-এর ওপরে)। তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের প্রবল প্রভাব। বর্তমান রাশিয়ায় পুতিনকে দেখা হয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের সেনাপতি হিসেবে। সাধারণ রুশদের মধ্যে একটি ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে- পুতিন না থাকলে রাশিয়াকে পশ্চিমারা ধ্বংস করে ফেলবে। তবে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এবং শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে যুদ্ধের কারণে এক ধরনের নীরব অসন্তোষ কাজ করছে, যা জনমতে সরাসরি প্রকাশ পায় না।

শি জিনপিং, চীন

শি জিনপিংয়ের জনপ্রিয়তা বর্তমানে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে, যা মূলত চীনের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি এবং আবাসন খাতের সংকটের কারণে। তবু চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এতটাই কঠোর যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো প্রকাশ্য অসন্তোষ দানা বাঁধতে পারে না। শির জনপ্রিয়তা এখন টিকে আছে জাতীয় গৌরব বা ন্যাশনাল প্রাইড-এর ওপর। হংকং নিয়ন্ত্রণ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে কড়া অবস্থানের কারণে কট্টর জাতীয়তাবাদী চীনাদের কাছে তিনি এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। তবে কর্মসংস্থান সংকটে থাকা তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কিছুটা নিম্নমুখী।

কিম জং উন, উত্তর কোরিয়া

কিম জং উনের দেশে জনপ্রিয়তা মাপার কোনো বৈজ্ঞানিক উপায় বা নিরপেক্ষ সংস্থা নেই। সেখানে কিমের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা মূলত রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি তার কন্যাকে জনসমক্ষে এনে এবং আধুনিক মিসাইল প্রযুক্তির মহড়া দিয়ে নিজের একটি পারিবারিক অভিভাবক ইমেজ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন শাসক নন, বরং সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সেখানে তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত, কারণ বিকল্প চিন্তা করার কোনো সুযোগ বা পরিবেশ সেখানে নেই।

এই চার নেতার জনপ্রিয়তার ভিত্তি যেমন ভিন্ন, তেমনি তার বহিঃপ্রকাশও বিচিত্র। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেখানে প্রতি ৪ বছর অন্তর ব্যালট পেপারের লড়াইয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়, সেখানে পুতিন বা শি জিনপিংয়ের জনপ্রিয়তার পেছনে কাজ করে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। আর কিম জং উনের ক্ষেত্রে সেই জনপ্রিয়তা টিকে থাকে স্রেফ বন্দুকের নলের মুখে প্রশ্নহীন আনুগত্যের ওপর। অর্থাৎ কারও জনপ্রিয়তা স্রেফ জনসমর্থন, আর কারও ক্ষেত্রে এটি স্রেফ টিকে থাকার কৌশল।

বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পর্ক

ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জন্য বিরোধী দল মানে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এখানে সরাসরি জেল-জুলুমের সুযোগ নেই, তাই ট্রাম্পের লড়াইটা প্রধানত আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক। তিনি বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের দেশদ্রোহী বা দুর্নীতিবাজ হিসেবে আক্রমণ করেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে চলা অসংখ্য আইনি মামলাকে তিনি উইচ হান্ট বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে প্রচার করে বিরোধীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন। তার ভাষায়, বিরোধীরা তাকে নয়, বরং তার মাধ্যমে দেশের জনগণকে আক্রমণ করছে।

ভ্লাদিমির পুতিন

রাশিয়ায় পুতিনের কাছে বিরোধিতা মানেই হলো কারাবরণ অথবা চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। ভ¬াদিমির পুতিন গত দুই দশকে রাশিয়ায় কোনো শক্তিশালী বিরোধী মুখ টিকে থাকতে দেননি। যারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন- যেমন অ্যালেক্সেই নাভালনি- তাদের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। এখানে দমন-পীড়ন চলে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। বিদেশি এজেন্টের তকমা দিয়ে এনজিও এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে পুতিনের বাইরে বিকল্প কোনো কণ্ঠস্বর মানুষের কানে না পৌঁছায়।

শি জিনপিং

চীনে বিরোধী দলের কোনো নামগন্ধও নেই, তবে শির লড়াই মূলত দলের ভেতরের শত্রু এবং সাধারণ জনগণের সম্ভাব্য বিক্ষোভের সঙ্গে। শি জিনপিংয়ের দমননীতি অনেকটা নীরব কিন্তু নিরেট। তিনি উন্নত প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে জনগণের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালান। হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকে তিনি যেভাবে কঠোর হস্তে দমন করেছেন, তা বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে যে শির চীনে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই। এখানে বিরোধী মানেই তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে রি-এডুকেশন ক্যাম্প বা কারান্তরালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কিম জং উন

কিম জং উনের দেশে বিরোধিতার শাস্তি কেবল মৃত্যু। কিম কেবল সাধারণ জনগণ নয়, তার নিজের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়দের ওপরও চরম দমননীতি চালিয়েছেন। নিজের ফুফা জং সং থায়েক বা ভাই কিম জং ন্যামের হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে, কিমের ক্ষমতায় ভাগ বসানো বা তার অবাধ্য হওয়ার পরিণাম কী। এখানে রাজনৈতিক বন্দিশিবিরগুলো এখনও সচল, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে স্রেফ সামান্যতম সন্দেহের কারণে বছরের পর বছর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ

তথ্য এখন আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই চার নেতা খুব ভালো করেই জানেন যে, মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হয়। তবে তাদের মাধ্যমগুলো ভিন্ন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্পের সঙ্গে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের (যেমন- সিএনএন বা নিউ ইয়র্ক টাইমস) সম্পর্ক চরম তিক্ত। তিনি প্রথাগত মিডিয়াকে এড়িয়ে সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছেন। তার নিজের প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ এবং এক্সে তার উপস্থিতি তাকে একজন ‘আনফিল্টারড’ নেতার ইমেজ দিয়েছে। ট্রাম্পের কৌশল হলো- তার বিরুদ্ধে যায় এমন যেকোনো খবরকে ফেইক নিউজ হিসেবে আখ্যা দেওয়া। তিনি তথ্যের একটি বিকল্প জগৎ তৈরি করেছেন, যেখানে তার সমর্থকরা কেবল তার দেওয়া তথ্যকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে।

ভ্লাদিমির পুতিন

রাশিয়ায় তথ্যপ্রবাহ পুরোপুরি ক্রেমলিনের নিয়ন্ত্রণে। পুতিন রাশিয়ার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে তার ব্যক্তিগত প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। সেখানে তাকে একজন বীর, অ্যাথলেট এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেখানে সেন্সরশিপ আরও কঠোর হয়েছে; যুদ্ধের সমালোচনা করলে বা সরকারি তথ্যের বাইরে কিছু বললে দীর্ঘমেয়াদি জেল হতে পারে। পুতিন রুশ নাগরিকদের জন্য ইন্টারনেটের একটি নিজস্ব সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছেন, যাতে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো তথ্য তাদের প্রভাবিত করতে না পারে।

শি জিনপিং

চীনের তথ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক এবং দুর্ভেদ্য। একে বলা হয় দ্য গ্রেট ফায়ারওয়াল অব চায়না। গুগল, ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম সেখানে নিষিদ্ধ। শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন একটি বিশাল ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষের ব্যক্তিগত মেসেজও স্ক্যান করা হয়। শির আদর্শ ও তার বক্তৃতা এখন চীনের স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে মোবাইল অ্যাপ পর্যন্ত সর্বত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখানে ভিন্নমতের কোনো তথ্য ছড়ানোর সুযোগ প্রায় শূন্য।

কিম জং উন

উত্তর কোরিয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তথ্যের ব্ল্যাকহোল। সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারা কেবল রাষ্ট্রীয় ইন্ট্রানেট ব্যবহার করতে পারে, যেখানে কেবল কিম পরিবারের গুণগান প্রচার করা হয়। কিম জং উন নিজেকে সেখানে প্রায় অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে সেখানে কোনো তথ্য পৌঁছাতে দেওয়া হয় না। উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরা কেবল সেটুকুই জানে, যেটুকু কিম তাদের জানাতে চান। এখানে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল খবর নয়, মানুষের চিন্তাশক্তিকেও বন্দি করে রাখা।

সামরিক সক্ষমতা

সামরিক সক্ষমতা এই চার নেতার ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি। তবে কেউ এই শক্তি ব্যবহার করেন বিশ্বজুড়ে নিজের মোড়লিপনা ধরে রাখতে, আবার কেউ এটি ব্যবহার করেন স্রেফ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ঢাল হিসেবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি, যার বার্ষিক বাজেট বাকি তিন দেশের সম্মিলিত বাজেটের চেয়েও বেশি। ট্রাম্পের সামরিক দর্শন হলো শান্তি আসবে শক্তির মাধ্যমে। তিনি ন্যাটোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমেরিকার নিজস্ব সামরিক আধুনিকায়নে বিশ্বাসী। তার সময়ে মহাকাশ বাহিনী গঠন এবং হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে। ট্রাম্পের কাছে সামরিক শক্তি হলো একটি দরকষাকষির হাতিয়ার- তিনি এটি সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহারের চেয়ে অন্য দেশকে ভয় দেখাতে বেশি পছন্দ করেন।

ভ¬াদিমির পুতিন ও রাশিয়া

রাশিয়ার সামরিক শক্তির মূলস্তম্ভ হলো তাদের বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার, যা সংখ্যার বিচারে আমেরিকার চেয়েও বেশি। পুতিনের অধীনে রাশিয়া তাদের পুরনো সোভিয়েত আমলের সামরিক কাঠামো বদলে আধুনিক ট্যাকটিক্যাল বাহিনী গড়ে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে পুতিন প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, রাশিয়ার সমরাস্ত্র প্রযুক্তিতে তারা পশ্চিমাদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে রাশিয়ার এস-৪০০ মিসাইল সিস্টেম এবং নতুন প্রজন্মের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল সারমাট পুতিনের ক্ষমতার অন্যতম বড় দাপট।

শি জিনপিং ও চীন

শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম বিশ্বমানের বাহিনীতে রূপান্তর করা। শির অধীনে চীন তাদের নৌবাহিনীকে এত দ্রুত সম্প্রসারিত করেছে যে, বর্তমানে জাহাজের সংখ্যায় তারা আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ান প্রণালিতে চীনের আধিপত্য শির সামরিক কৌশলের বড় জয়। চীন এখন কেবল সংখ্যার দিক থেকে নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ড্রোন এবং সাইবার যুদ্ধের সক্ষমতায় নিজেদের অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।

কিম জং উন ও উত্তর কোরিয়া

বাকি তিন দেশের তুলনায় উত্তর কোরিয়ার প্রথাগত সামরিক শক্তি দুর্বল হলেও কিম জং উন তার দেশকে পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত করে সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। কিমের কাছে পারমাণবিক বোমা হলো তার শাসনের লাইফলাইন। তিনি নিয়মিতভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল পরীক্ষা করে আমেরিকাকে সরাসরি হুমকির মুখে রাখেন। কিমের সামরিক শক্তি মূলত প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং এটি বিশ্বসম্প্রদায়কে চাপে রেখে নিজের দাবি আদায়ের একটি বড় মাধ্যম।

বৈশ্বিক প্রভাব

বর্তমান বিশ্বরাজনীতি এখন আর একক কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। এই চার নেতার পররাষ্ট্রনীতি পৃথিবীকে বিভিন্ন মেরুতে বিভক্ত করে ফেলেছে। তাদের ব্যক্তিগত কূটনীতি এবং কৌশল বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শান্তিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কোনো আদর্শের ওপর নয়, বরং লেনদেন এর ওপর ভিত্তি করে চলে। তিনি মনে করেন, আমেরিকা এতদিন অন্য দেশের সুরক্ষা দিতে গিয়ে নিজেদের পকেট খালি করেছে। তাই তিনি ন্যাটোর মতো পুরনো জোটগুলোকে চাপে রাখেন এবং মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সুরক্ষা বাবদ অর্থ দাবি করেন। ট্রাম্পের প্রভাব হলো- তিনি বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বা ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে প্রমাণ করেছে যে, আমেরিকার স্বার্থই তার কাছে সবার ওপরে।

ভ¬াদিমির পুতিন

পুতিনের মূল লক্ষ্য হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই পুরনো গৌরব ও প্রভাব ফিরিয়ে আনা। তার পররাষ্ট্রনীতি মূলত পশ্চিমা বা ন্যাটোর বিস্তার ঠেকানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে বার্তা দিয়েছেন যে, রাশিয়ার দোরগোড়ায় পশ্চিমাদের উপস্থিতি তিনি সহ্য করবেন না। পুতিন এখন কেবল ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই; আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেও তিনি রাশিয়ার প্রভাব বাড়াচ্ছেন। তিনি চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি শক্তিশালী পশ্চিমাবিরোধী ব্লক তৈরি করেছেন, যা বর্তমান বিশ্বকে একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শি জিনপিং

শি জিনপিংয়ের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং অর্থনৈতিক শক্তিচালিত। তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের শতাধিক দেশকে চীনের ঋণের জালে এবং অবকাঠামোগত বলয়ে নিয়ে এসেছেন। শির লক্ষ্য হলো ২০৪৯ সালের মধ্যে আমেরিকাকে টপকে বিশ্বের প্রধান শক্তিতে পরিণত হওয়া। তিনি সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং সফট পাওয়ারের মাধ্যমে বিশ্বকে বেইজিংমুখী করতে বেশি আগ্রহী। বর্তমান বিশ্বে চীন এখন আমেরিকার প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী।

কিম জং উন

কিম জং উনের পররাষ্ট্রনীতি মূলত তার দেশের ওপর থাকা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং টিকে থাকার লড়াই। তিনি একদিকে যেমন রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে নিজেকে শক্তিশালী করছেন, অন্যদিকে চীনের ছত্রছায়ায় থেকে নিজের অর্থনীতি সচল রাখছেন। কিমের কৌশল হলো- পারমাণবিক অস্ত্র প্রদর্শন করে বিশ্বনেতাদের আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করা। তার প্রভাব মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, একটি ছোট দেশও যদি পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান হয়, তবে বড় শক্তিগুলো তাকে অবজ্ঞা করতে পারে না।

আগামীর অনিশ্চয়তা

এই চার নেতার শাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রাষ্ট্রের চেয়েও বড় বা অপরিহার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো শাসকের ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এই চারজন যখন দৃশ্যপটে থাকবেন না, তখন তাদের দেশ এবং বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ কেমন হবে?

ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টি

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ট্রাম্প কেবল একজন প্রেসিডেন্ট নন, তিনি একটি আদর্শ বা মুভমেন্টের নাম। তিনি মার্কিন রিপাবলিকান পার্টিকে প্রথাগত রক্ষণশীলতা থেকে বের করে এনে ট্রাম্পিজমে রূপান্তর করেছেন। ট্রাম্পের অবর্তমানে এই দলটির অস্তিত্ব এবং তার বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী (গধশব অসবৎরপধ এৎবধঃ অমধরহ) কার পেছনে দাঁড়াবে, তা এক বিশাল প্রশ্ন। ট্রাম্প কি কোনো উত্তরাধিকারী তৈরি করে যাবেন, নাকি তার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টিতে এক দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বের সংকট তৈরি হবে? এই অনিশ্চয়তা মার্কিন গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

পুতিন ও শির উত্তরাধিকারীশূন্যতা

রাশিয়া ও চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। পুতিন ও শি জিনপিং- উভয়েই সংবিধান সংশোধন করে আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকার পথ পরিষ্কার করেছেন। তাদের শাসনামলে দলের ভেতরে কোনো শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। পুতিন বা শির হঠাৎ প্রস্থান রাশিয়া বা চীনে এক ভয়াবহ পাওয়ার ভ্যাকুয়াম বা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশে কোনো বিশৃঙ্খল ক্ষমতা বদল পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। শির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; তার তৈরি করা কঠোর কাঠামোর বাইরে চীনের পরবর্তী নেতৃত্ব কেমন হবে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ ধারণা বেইজিংয়ের বাইরে কারও নেই।

কিম জং উন এবং বংশপরম্পরার লড়াই

উত্তর কোরিয়ায় উত্তরাধিকারের বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হলেও তা ঝুঁকিমুক্ত নয়। কিম জং উন কয়েক বছর ধরে তার কিশোরী কন্যাকে (কিম জু-আয়ে) বিভিন্ন সামরিক মহড়া ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সঙ্গে রাখছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কিম পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মকে ক্ষমতার জন্য তৈরি করছেন। তবে একটি চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর কর্তারা কিমের মৃত্যুর পর একজন অল্পবয়সী নারীকে নেতা হিসেবে মেনে নেবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। কিমের বিদায় মানে উত্তর কোরিয়ায় বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা।

ইতিহাসের কাঠগড়ায়

এই চার নেতার উত্তরাধিকার কেবল তাদের পরিবারের বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা বিশ্বব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এনেছেন, তার রেশ থাকবে দশকের পর দশক। তারা এমন এক পৃথিবীর জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন যেখানে গণতন্ত্রের চেয়ে একক আধিপত্য আর আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে সামরিক শক্তি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামীর ইতিহাসবিদরা তাদের ত্রাণকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করবেন নাকি আধুনিক বিশ্বের বিপর্যয় হিসেবে- তা নির্ভর করবে তাদের বিদায়ের পর পৃথিবী কতটা স্থিতিশীল থাকে তার ওপর।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com