

লক্ষ্মীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্রের বিরুদ্ধে একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের জাল সনদ তদন্তের কার্যক্রমে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড পরীক্ষার জাল সনদ দিয়ে নিয়োগের অভিযোগ আনা হলেও শিক্ষা কর্মকর্তা তা নিয়ে কোনো তদন্ত করেননি। একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের সনদ দিয়েই তিনি তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে অভিযোগকারী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযোগকারী সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে একই দাবিতে তিনি গত ১ জুন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগ সূত্র জানা যায়, গত ৪ মার্চ জেলা প্রশাসকের কাছে সদর উপজেলার মুনছুর আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষক নেতা ইব্রাহিম লিখিত অভিযোগ করেছেন। কামাল নিউ রাজধানী প্রশিক্ষণ কলেজ ঢাকা থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদ (২০০১) দেখিয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি একই সনদ দিয়ে ২০১৫ সালের ৩০ মে সদরের হাসন্দি বিজয়নগর নারী শিক্ষা নিকেতন ও ২০১৯ সালের ২৪ জুন পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমির প্রধান শিক্ষকের জন্য আবদেন করেন। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদটি যাছাই (১০ ডিসেম্বর ২০২৫) করলে জানা যায় সনদটির ফলাফল ফেল।
এ ঘটনায় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্রকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। তবে তদন্ত কার্যক্রমটি শিক্ষা কর্মকর্তা তার কার্যালয়ে না করে বিদ্যালয় গিয়ে সম্পন্ন করেন। এর মধ্যে অভিযোগকারী ইব্রাহিম খলিল ওই বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শিক্ষা কর্মকর্তা কার্যক্রম সম্পন্ন করে চলে আসেন। এতে পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। এ ছাড়া অভিযোগ সনদটি যাচাই-বাছাই না করে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিএড সনদের ওপর গত ২০ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করেন শিক্ষা কর্মকর্তা। কিন্তু কামালের নিয়োগকালীন সময় এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে আবেদনে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’র সনদটি ব্যবহৃত হয়নি।
এদিকে ২০১৯ সালের ৪ আগস্টে কামালের বিএসএস (পাস) ও বিএড সনদের সত্যায়িত করেন সাবেক সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তালেব। দুটি সনদেই রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার (১৩৭৬৫৫) ও শিক্ষাবর্ষের সাল (১৯৯৬-৯৭) এক। যেহেতু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করা ছাড়া বিএড করা সম্ভব নয়, সেহেতু তার বিএড জাল সনদটি পুরোটিই জাল। এছাড়া গত ১০ ডিসেম্বর যাচাই করা হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয় বিএড সনদের ফলাফল ফেল। আর পরীক্ষার সঠিক শিক্ষাবর্ষ ২০০০-২০০১ সাল।
জাল সনদে সত্যায়িত করার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বৃহস্পতিবার বিকেলে সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তালেবের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন। তবে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের আভাস দিয়ে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলেন। পরে কল কেটে পুনরায় একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অভিযুক্ত শিক্ষক কামাল হোসেন বলেন, ‘সনদের বিষয়ে অভিযোগের তদন্ত শেষ। এগুলো নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কিছু নেই।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র বলেন, ‘আমি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। শিক্ষক কামালের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদ নেই। উনার কাছে আমি মূল সনদ চেয়েছি। উনি আমাকে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা এই প্রতিষ্ঠানটি সনদ দিয়েছে। তবে যে সনদ দিয়ে কামাল প্রধান শিক্ষক হয়েছে, ওই সনদের কোন তদন্ত তিনি করেননি। উল্টো বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন।’
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসানের দাপ্তরিক মোবাইলফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবা উল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়ার অভিযোগটি আমার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।’