

ক্রিম উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে স্কিন কেয়ার ক্রিম আমদানি করে ভেজিটেবল ফ্যাট ঘোষণায় পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু করে সাদাফ ট্রেডিং। পরীক্ষণের প্রক্রিয়ার মধ্যে পণ্যের চালানটি আটকে দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্ট সেল (সিআইসি)। পরবর্তী সময়ে স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য খুলনা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে (কুয়েট) পাঠায়। আর রাসায়নিক পরীক্ষায় পণ্যটির আসল পরিচয় বেরিয়ে আসে। শুল্ক ফাঁকি দিতে ভেজিটেবল ফ্যাট ঘোষণার আড়ালে স্কিন কেয়ার ক্রিম থেকে শুরু করে পেট্রোলিয়াম জেলি নিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি। এতে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, রাজধানীর চকবাজারের সাদাফ ট্রেডিং গত ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ক্রিম উৎপাদন ও বিপণনকারী একটি কোম্পানি থেকে ভেজিটেবল ফ্যাট ঘোষণায় পণ্য নিয়ে আসে। উচ্চ শুল্কের এ পণ্যের চালানে রাজস্ব ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি ভেজিটেবল ফ্যাট হিসেবে ঘোষণা দেয়। শুরু থেকে পণ্যের চালানটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের কমিশনারের পক্ষ থেকে পণ্যের চালানটি নিয়ে অবজারবেশনে ছিল। এ ছাড়া পণ্যের চালানটি নিয়ে সিআইসির কাছে গোপন তথ্য থাকায় এনবিআরের এ গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পণ্য চালানটির বিল অব এন্ট্রি লক দিতে বলা হয়। আটককৃত এ চালানটির পণ্য রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য কুয়েটে পাঠানো হয়। আর রাসায়নিক পরীক্ষায় ভেজিটেবল ফ্যাট ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য চালানে ফেস ক্রিম থেকে শুরু করে কসমেটিক পণ্য পাওয়া যায়। ভেজিটেবল ফ্যাটের সর্বমোট শুল্ককর হচ্ছে ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর ফেস ক্রিম বা লসনের শুল্ককর হলো ১৬২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। যে কারণে শুধু এই এক চালানেই সরকারের সরাসরি ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা ফাঁকির চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। শুল্ক আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণা দিলে সমপরিমাণ বা দ্বিগুণ জরিমানা করার বিধান বলবৎ রয়েছে। সে হিসাবে ন্যূনতম প্রায় ২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুর কর্তৃপক্ষ।
মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির বিষয়ে জানতে চাইলে সাদাফ ট্রেডিংয়ের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান এন এম ট্রেডার্সের মালিক রফিক কালবেলাকে বলেন, ভেজিটেবল ফ্যাট আমদানি করা হয়েছে। ক্রিম এবং ভেজিটেবল ফ্যাট লিকুইড ধরনের পণ্য। এখানে মিথ্যা ঘোষণা হয়নি বলেও দাবি এই সিঅ্যান্ডএফের। কুয়েটের পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, কুয়েটে পরীক্ষা হয়েছে। আমদানিকারক পণ্য চালানটি বিসিএসআইআরে পরীক্ষার জন্য আবেদন করেছেন। আসলে এ পরীক্ষায় প্রকৃত বিষয়টি বোঝা যাবে বলেও জানান তিনি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সাদাফ ট্রেডিং পাকিস্তানের ইভান অ্যান্ড মায়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্যের চালানটি নিয়ে আসে। ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি সব ধরনের কসমেটিক পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করে। বিভিন্ন ধরনের ফেস ক্রিম কোম্পানিটি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকে। এর আগেও এ ধরনের পণ্যের চালান খালাস করে নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের কঠোর নজরদারি না থাকায় এসব পণ্যের চালান খালাসের অপচেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কাস্টম হাউসের এক শীর্ষ নির্বাহী কালবেলাকে বলেন, এরই মধ্যে গত এক বছরে এই আমদানিকারক কী ধরনের পণ্যের চালান আমদানি করেছে তার তথ্য নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির গত এক বছরের ভ্যাট থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রির যাবতীয় বিষয় যাচাই-বাছাই করে আগামী পনেরো দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন ওই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টম হাউস আইসিডির সংশ্লিষ্ট গ্রুপের দায়িত্বরত সহকারী কমিশনার খুশরিনা পারভীন কালবেলাকে বলেন, সাদাফ ট্রেডিংয়ের পণ্য চালান নিয়ে কমিশনারের অবজারভেশন ছিল। তিনি পণ্য চালানটি প্রাথমিকভাবে লক দিতে বলেছেন। এ ছাড়া পণ্য চালান নিয়ে সিআইসির অবজারভেশন ছিল, যার কায়িক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পণ্যের চালানটি আটক রয়েছে। বড় অঙ্কের শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি সিআইসির মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হলেও সংশ্লিষ্ট শাখা তৎপর বলেও দাবি এ কর্মকর্তার।