

বাল্যবিবাহ নির্মূলে বাংলাদেশের লাগতে পারে ১৫ বছর। ভীষণ রকমের চমকে ওঠার মতো কথা। কিন্তু ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ শতাংশ হারে বাল্যবিবাহ কমছে। এই হারে কমলে বাংলাদেশ থেকে বাল্যবিবাহ দূর করতে সময় লাগবে ২১৫ বছর।’ এক বছর আগে (৫ জুন ২০২৪) বাল্যবিবাহ বন্ধে আয়েজিত এক অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেছিলেন বাংলাদেশে ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি ক্রিস্টিন ব্লুখুস। অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুসারে বাল্যবিবাহ নির্মূলে বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে ২২ গুণ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ যেন এক নীরব মহামারী। নগরজীবনের আলো-আঁধারে হয়তো আমরা তা কম দেখি, কিন্তু গ্রাম এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাল্যবিবাহ এখনও নিয়মিত, স্বাভাবিক ও সামাজিকভাবে মেনে নেওয়া ঘটনা। প্রশাসনের অভিযান, আইন, সচেতনতা, এনজিও কার্যক্রম- সবকিছুর পরও কোথাও যেন থামছে না এই অকাল বৈবাহিক নিষ্পেষণ। প্রশ্ন উঠছে- কেন বাল্যবিবাহ এখনও নীরবে চলছেই? কারা এ সমস্যার মূল চালিকাশক্তি? আর কোন অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে? চলুন জেনে নিই।
বাল্যবিবাহের পেছনে রয়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন কারণ। শুধু দারিদ্র্য নয়, আছে সামাজিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব এবং পারিবারিক মানসিকতা। অসহায় পরিবারে মেয়ে সন্তানকে ‘দায়’ মনে করা হয়। আর্থিক বোঝা কমাতে তারা অল্পবয়সেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘দারিদ্র্য বাল্যবিবাহের প্রধান চালিকাশক্তি- জীবনের নিরাপত্তা বেচে দিতে হয় ভবিষ্যতের ঝুঁঁকি মনে করে।’
মেয়েদের স্কুলে আসা-যাওয়া, পাবলিক স্থানে চলাফেরা বা কর্মস্থলে যাওয়ার নিরাপত্তাহীনতায় পরিবারগুলোতে বিয়ে দিয়ে ‘সমস্যা সমাধান’-এর চেষ্টা করা হয়। এই মানসিকতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর, কারণ এটি সমাজের অপরাধ নয়, মেয়েটির ভবিষ্যৎকেই শাস্তি দেওয়া। গ্রামাঞ্চলে মাধ্যমিক স্তরের স্কুল দূরে হওয়ায়, পরিবহন সমস্যা এবং পরিবারের উদাসীনতায় মেয়েদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষা বন্ধ হলেই বিয়ে যেন স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। ‘মেয়ে বড় হলে ঘরে রাখা ঠিক নয়’, ‘বিয়েই মেয়ের ভবিষ্যৎ’- এ ধরনের কথাবার্তা এখনও অনেক এলাকায় প্রচলিত। সামাজিক চাপ ও অভিভাবকদের সম্মান-ভয়ের জায়গা থেকেও অনেক বিয়ে গোপনে হয়ে যায়।
অনেক পরিবার মনে করে- ‘ছোট বয়সে যৌতুক কম লাগে, তাই এখনই বিয়ে দাও।’ এ বাস্তবতা দারিদ্র্যের সঙ্গে মিলে বিয়ের বয়স আরও কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন থাকলেও অনেক অঞ্চলে এর প্রয়োগ ঢিলেঢালা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় পরিবারের ‘মানবিক’ বিবেচনায় বিয়ে থামাতে চান না। ফলে আইন থাকে কাগজে, বাস্তবে পরিস্থিতি বদলায় না। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার উচ্চ। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো হলো- রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁ জেলা। এসব অঞ্চলের গ্রামীণ দারিদ্র্য, শিক্ষার স্বল্পতা ও পুরনো সামাজিক প্রথা বাল্যবিবাহের বড় কারণ। কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট এলাকায় বাল্যবিবাহ এখনও নিত্যদিনের ঘটনা। দারিদ্র্য, বন্যা-জলাবদ্ধতা এবং অভিবাসন-উপজীবিকার অনিশ্চয়তা বাল্যবিবাহকে ত্বরান্বিত করে। দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও যশোরের কিছু উপজেলায় বাল্যবিবাহ বেশি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, সাইড জবের অভাব এবং সামাজিক রক্ষণশীলতা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ অঞ্চলে হাওর এলাকার পরিবারগুলোতে কন্যাশিশুদের শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটে, যার ফলে বাল্যবিবাহ সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। বর্ষায় স্কুলে যাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেক শিক্ষাই মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। কক্সবাজারের কিছু এলাকা, বিশেষ করে টেকনাফ-উখিয়ার গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য ও সামাজিক চাপের কারণে অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।
বাল্যবিবাহ থামাতে আইন আছে, অভিযানও হয়- কিন্তু সমস্যার মূল জায়গা সামাজব্যবস্থা। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। মেয়েদের শিক্ষাজীবন সুরক্ষা ও স্কুলে যাতায়াতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পণবিরোধী কঠোর আইন প্রয়োগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি, গরিব পরিবারে মেয়ের জন্য ভাতা বা প্রণোদনা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন ও যুবসমাজকে সচেতন করা। সবচেয়ে বড় কথা- মেয়েদের জীবনের সিদ্ধান্ত তার নিজের হওয়া উচিত, সমাজ বা আর্থি