

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জেলা ও শহর রয়েছে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে। কিন্তু এই ঝুঁকি নিরূপণে গভীর গবেষণা বা বিস্তারিত সমীক্ষা করা হয়নি। এখন পর্যন্ত কার্যকর, সমন্বিত বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো পদক্ষেপও সরকার গ্রহণ করেনি। শুক্রবার সকালে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়। ৫ শতাধিক মানুষ আহত হন। ঢাকা ও নরসিংদীতে অসংখ্য ভবনে ফাটল দেখা দেয়। ঢাকায় কয়েকটি ভবন হেলে পড়ে। ভূতত্ত্ব¡বিদরা দেশে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো মুহূর্তে একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকা শহরকে কার্যত স্তূপে পরিণত করতে পারে, আর তার জন্য সরকারি পর্যায়ে প্রস্তুতিতে রয়েছে মারাত্মক উদাসীনতা ও গলদ। রয়েছে সক্ষমতার ঘাটতিও। যে কারণে তারা ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণে বিশদ গবেষণা বা সমীক্ষা করার জোর তাগিদ দিয়েছেন। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সক্রিয় ও লুকানো ভূমিকম্পের ফল্টগুলোর দ্রুত ম্যাপিং করে জাতীয় ভূমিকম্প ঝুঁঁকি মানচিত্রে আপডেট তথ্য যুক্ত করারও তাগিদ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. আনোয়ার জাহিদ গতকাল আমাদের সময়কে বলেছেন, আমাদের এখনই ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণের কাজ শুরু করতে হবে। ভূমিকম্পের গতি-প্রকৃতি জানতে গভীর গবেষণা বা সমীক্ষা করতে হবে। আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ীভাবে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। ভূমিকম্পের ফল্টগুলোয় ধাক্কাধাক্কির ফলে কী পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে, কত গভীরে হচ্ছে, কতটা ধাক্কা লাগতে পারে এগুলো নিয়ে স্টাডি করতে হবে।
ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল মোটেই স্থির নয়। নরসিংদীর ভূমিকম্পের ফলে ভূগর্ভ চাপমুক্ত করেছে, এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। বরং ধীরে ধীরে চাপ বাড়ছে এবং যে কোনো সময় এ ধরনের আরও ভূমিকম্প ঘটতে পারে। বাংলাদেশের ভেতর ও বাইরের ‘মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট, প্লেট বাউন্ডারি, আরাকান সাবডাকশন জোন’ আরও বড় মাত্রার ভূকম্পন তৈরি করতে পারে।
রিখটার স্কেলে পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পে গত শুক্রবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ কেঁপে ওঠে। এ ঘটনায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর আসে। ভূমিকম্পের পর বেশকিছু ভবনে ফাটল ধরা, হেলে পড়াসহ নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির খবর পাওয়া যায়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির স্থায়িত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড।
এ ভূমিকম্পের পর নরসিংদীতে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলে ছুটে যায় বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের একটি জরিপ দল। তারা সেখানে ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট ভূমির ফাটল ও ধসের কারণ নির্ণয়ে মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে। গবেষণার জন্য সংগ্রহ করে বেশকিছু নমুনা। তারা ভূমিক্ষয়, ফাটল ও মাটিধসের স্থানগুলো পরিদর্শন করেন।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের ভূকম্পন ও ভূ-বৈদ্যুতিক জরিপ শাখার উপ-পরিচালক মো. শাহজাহান আমাদের সময়কে বলেন, জরিপ দল ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের গতি-প্রকৃতি জানার জন্য উৎসস্থল পরিদর্শন করে। ভূমিকম্পের ফলে যে ফাটলগুলো হয়েছে, তা কোন দিক থেকে কোন দিকে গেছে তা সরেজমিনে দেখেছে। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারব কী ধরনের ভূমিকম্প ছিল, মাটির কতটা গভীরে ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পরশু জ¦ালানি উপদেষ্টার কাছে দাখিল করা হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ৩৯টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে। এর মধ্যে ১১টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে। অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছে। এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ৩ দশমিক ৩ থেকে ৫ দশমিক ৭।
আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের সীমান্তে তিনটি টেকটনিক প্লেট আছে। এই তিনটি প্লেটই সক্রিয়। প্রতিনিয়ত এখানে ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। প্লেট বাউন্ডারির পাশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে। নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে। এখানে আগে ছোট ছোট ভূমিকম্প হলেও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই সাব-ফল্ট অনেক বড়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো একটি সঠিক ‘ভূমিকম্প হ্যাজার্ড ম্যাপ’ তৈরি করা। এই ম্যাপে দেখানো হয়, কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভূমিকম্পের কারণে মাটির কম্পন বা ভূমিধ্বসের সম্ভাবনা কতটুকু। অথচ, বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবহৃত ম্যাপগুলো বহু পুরনো বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মডেলের ভিত্তিতে তৈরি।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণে উচ্চ রেজুলেশনের সিসমিক জরিপ চালানো এবং তা নিয়মিত হালনাগাদ করা। এটি নতুন ভবন নির্মাণের সময় প্রকৌশলীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও অপরিহার্য।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প নিয়ে একটি বিস্তারিত এবং জাতীয়ভিত্তিক সমীক্ষা কবে শেষ হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্টদের কাছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেখানে নিয়মিতভাবে তাদের ‘হ্যাজার্ড ম্যাপ’ হালনাগাদ করছে, সেখানে বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ প্রায় অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের ভূকম্পন ও ভূ-বৈদ্যুতিক জরিপ শাখার উপ-পরিচালক ও যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্পবিষয়ক গবেষক আক্তারুল আহসান বলেছেন, ভূমিকম্প বিদ্যার অন্তর্দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় পূর্বে যা ভাবা হয়েছিল, আমাদের তার চেয়েও বেশি ফল্ট রয়েছে এবং বাংলাদেশে সক্রিয় ফল্ট মানচিত্র যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপডেট জরুরি ভিত্তিতে করা উচিত। কারণ বিল্ডিং কোড এডাপটেশন, হেজার্ড জোনেশন, রেসকিউ অপারেশন এবং ডিজাজস্টার ম্যানেজমেন্টসহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সরাসরি আমাদের ‘ফল্ট ম্যাপিং’-এর ওপর নির্ভরশীল।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে আমাদের উদ্ধার তৎপরতায় কতটুকু সক্ষমতা রয়েছে তা এখনই ভাবতে হবে। এক রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের ১৫/২০ দিন লেগেছিল উদ্ধার তৎপরতায়। কিন্তু ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পে যদি কয়েকশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধসের কারণে রাস্তাঘাট যদি বন্ধ হয়ে যায় তখন কীভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হবে সেটা এখনই ভাবতে হবে। উদ্ধার করার মতো যথেষ্ট যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত লোকবল থাকতে হবে। যদি হাসপাতালগুলো আক্রান্ত হয় তাহলে চিকিৎসা কোথায় ও কিভাবে দেওয়া হবে সেটাও গভীরভাবে ভাবতে হবে।
২০১৬ সালে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়। এই সেন্টার নির্মাণে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় জায়গাও বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তার কোনো অগ্রগতি নেই। ভূমিকম্প ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে দেশে একাধিক সরকারি সংস্থা রয়েছে। কিন্তু সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকট বলে জানা গেছে।