বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৫৩ অপরাহ্ন

নন-এমপিও শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপন

বিডি ডেইলি অনলাইন ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৯৫ বার

দেশের নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বর্তমানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যাঁদের হাতে গড়ে ওঠার কথা ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সেই শিক্ষকরাই বছরের পর বছর বিনা বেতনে কিংবা নগণ্য সম্মানী পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। কেউ মসজিদে ইমামতি করছেন, কেউ আদালতে মুহুরির কাজ নিচ্ছেন, কেউ বা চালাচ্ছেন ছোট দোকান। আর এই দুর্দশার মূল কারণ দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অচলাবস্থা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় স্থবির হয়ে থাকা সরকারি নীতিমালা।

নন-এমপিও হওয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও বঞ্চনা দেশে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠদানের অনুমতি পেলেও এমপিওভুক্ত হতে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ডকুমেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড পরিদর্শন, রিপোর্ট ও পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া পার হওয়ার পর তিন বছর পর পাওয়া যায় একাডেমিক স্বীকৃতি; যা এমপিওভুক্তির প্রথম শর্ত।

কিন্তু ২০২১ সালের আগের নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে নানা সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় এমপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এমপিদের ডিও লেটারের প্রভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবেও প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়েছে। ফলে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় প্রতিষ্ঠিত বহু প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ হাজার নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের অনেকেই দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বঞ্চনার চক্রে ঘুরছেন।

দুই দশকেও এমপিওভুক্ত নয় পবার টিকর কলেজ

রাজশাহীর পবা উপজেলার কে এইচ টিকর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে।

দুই দশক পার হলেও এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। বাংলা বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষকতা করার স্বপ্ন নিয়ে যোগ দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে এমপিও হবে। কিন্তু ২০ বছরেও হলো না। এখন মসজিদে ইমামতি করি, টিউশনি করে কোনোমতে সংসার চালাই। সন্তানদের স্কুল ফি দিতে না পেরে অনেক সময় লজ্জায় লুকাতে হয়।’ তাঁর চার সদস্যের পরিবার। মাঝেমধ্যে স্কুল থেকে বকেয়া টাকার জন্য ফোন আসে; তিনি বলেন, ‘মসজিদের ঘরে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।’

আইসিটি শিক্ষক এখন আদালতের মুহুরি

একই কলেজের আইসিটি লেকচারার মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ জানান, বিনা বেতনে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব না হওয়ায় তিনি রাজশাহী আদালতে মুহুরির কাজ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘অফিস শেষে কলেজে গিয়ে পড়াতে হয়। শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, আমি দুই আলাদা মানুষ। একজন শিক্ষক, আরেকজন জীবিকার যুদ্ধ চালানো শ্রমিক।’ তিনি আরও জানান, চাকরির শুরুতে পরিবারের জন্য বড় স্বপ্ন ছিল, এখন মাস শেষে মায়ের ওষুধের খরচই সামলাতে পারেন না।

বঞ্চিত মির্জাপুর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা

রাজশাহীর মির্জাপুর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। দুই দশক পেরোলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন এখন ব্রেন স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘চাকরি আছে, বেতন নেইÑ এটাই পরিচয়।’ টিউশনিতে পাওয়া সামান্য আয় দিয়ে চার সদস্যের পরিবার চালাতে না পেরে তিনি ছোট একটি মুদি দোকান খুলেছিলেন। পুঁজির অভাবে সেটিও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি। নিয়মিত চিকিৎসা চালানোর সামর্থ্য নেই; খরচের অভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ওষুধ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

বঞ্চিত শিক্ষকদের আন্দোলন

গত এক দশকে ‘নন-এমপিও ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে আন্দোলন বহুবার তীব্র হয়েছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি, জাতীয় প্রেসক্লাবে টানা ১৭ দিন অবস্থান, রমজানে কাফনের কাপড় পরে প্রতিবাদ, প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের নির্দেশÑ সবই আন্দোলনে গতিশীলতা আনলেও ফল আসেনি।

চলতি বছরের এপ্রিলেও প্রেসক্লাবে অবস্থানকালে শিক্ষা উপদেষ্টা মৌখিকভাবে জানান, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এমপিও প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হলেও তালিকা চূড়ান্ত করতে পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত লাগবে।’

এতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের হতাশা আরও গভীর হয়। তাঁদের আশঙ্কা, জাতীয় নির্বাচনের আগেই সিদ্ধান্ত না হলে পরবর্তীতে বিষয়টি আবার ড্রয়ারবন্দি হয়ে যাবে। সম্মিলিত নন-এমপিও ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সমন্বয়ক অধ্যক্ষ মনিমুল হক বলেন, ‘প্রতিটি নির্বাচনই আমাদের আতঙ্ক। সরকার বদলালে ফাইলের অবস্থানও বদলায়। আমাদের কথা কে বলবে?’ আরেক শিক্ষক তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের চাওয়া খুব ছোট, একটা সম্মানজনক বেতন, যাতে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারি। আমরা কোনো রাজনৈতিক দাবি করছি না; বাঁচার দাবি করছি।’

‘এটি শুধু আর্থিক নয়-মর্যাদার বঞ্চনা’

নন-এমপিও শিক্ষকদের বঞ্চনার এই দীর্ঘ ইতিহাস শুধু আর্থিক নয়, এটি মর্যাদা ও স্বীকৃতিহীনতার ইতিহাস বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র কি তার শিক্ষকদের এমন অবস্থায় দেখতে চায়? কবে আসবে সেই দিন, যখন শিক্ষক পরিচয় মানেই হবে সম্মান, অনিশ্চয়তা নয়? আমরা শুধু বেতন চাই না, মানবিক জীবন চাই। শিক্ষকতা যে পেশা নয়, একটি দায়বদ্ধতা, সেটির স্বীকৃতি চাই।’

উল্লেখ্য, দেশের প্রায় ৩ হাজার নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছে, অথচ তাঁদের শিক্ষকরা আজও সরকারি বেতন-ভাতার বাইরে। সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় হাজারো পরিবার অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে।

শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 bangladeshdailyonline.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com